নববর্ষ ঘিরে ব্যস্ত কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্পীরা

মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ ।। তীব্র না হলেও বেশ খরতাপ শুরু হয়েছে। চৈত্রের রৌদ্রদগ্ধ দিন জানান দিচ্ছে পহেলা বৈশাখ মাত্র কয়েক দিন বাকি। আর সেই উৎসবকে ঘিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কিশোরগঞ্জের মৃৎশিল্পীরা।

তৈরি হচ্ছে হাজার বছরের পুরনো শখের হাঁড়ি, পঞ্চসাঞ্জি, মাটির পুতুলসহ বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন তৈজসপত্র। বাঙালি জাতির অন্যতম ঐতিহ্য মৃৎশিল্প। মেলার মধ্যদিয়ে হারাতে বসা মৃৎশিল্পকে জিইয়ে রাখতেই নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা। এই শিল্পের চাহিদা বছরের অন্যসব সময়ে কম থাকলেও মহান স্বাধীনতা দিবস, অষ্টমী ও পহেলা বৈশাখে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ছাড়া যেন বাঙালিদের চলেই না। তাই এই সময়ে অন্যান্য সময়ের চেয়ে মৃৎশিল্পীদের একটু বেশিই ব্যস্ত সময় পাড় করতে হয়, আর হচ্ছেও তাই।

সরেজমিনে জেলার অন্যতম কুলিয়ারচরের পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বেশ কর্মমুখর পালপাড়ার প্রতিটি বাড়ি। নির্ঘুম দিন পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। পহেলা বৈশাখ কে সামনে রেখে এখানে বাড়ির নারী-পুরুষের দক্ষহাতের সুনিপুণ নৈপুণ্যে তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যের নানা সামগ্রী। মাটির বৌ-পুতুল, শখের হাড়ি, ছোট-ছোট শিকে পাতিল, সানকিসহ তৈরি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র। মৃৎশিল্পীরা গড়ছেন মাটির গাছ, পাখি, ফুল, ফুলের টপ, ফলমূলসহ বিভিন্ন বাসনকোসন ও ছোট ছেলে মেয়েদের জন্য নজর কাড়া বিভিন্ন খেলনা। তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে বিভিন্ন মাটির তৈরির খেলনার আকৃতি দিচ্ছেন, করছেন পণ্যে রংয়ের কাজ। রঙিন এসব পণ্য নেয়া হবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মেলায়। বৈশাখী মেলায় এমন বর্ণিল মৃৎশিল্পের কদর থাকায় আসছেন ভিন জেলার ক্রেতারাও।

পালপাড়ার বাসিন্দা কুকিলা রাণী পাল জানান, বর্তমানে তাদের দিন রাত কাজ করতে হচ্ছে। সামনের পহেলা বৈশাখসহ বেশ কয়েকটি মেলা আছে, সেসব মেলায় তাদের বিক্রি সবচেয়ে বেশি হবে।

মাটির তৈরি নানা খেলনা, রং করায় ব্যস্ত এখানকার আরেক মৃৎশিল্পী জীবন কৃষ্ণ পাল জানান, বৈশাখী মেলা সামনে রেখে এক একটি পরিবার প্রায় ২ হাজার খেলনাসহ মাটির জিনিসপত্র তৈরি করেছেন এবং ইতিমধ্যে রংয়ের কাজও প্রায় শেষ করা হয়েছে। মেলায় বিক্রির জন্য পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের একসময় বিপুল কদর থাকলেও বছরের অন্যান্য দিনে তারা বেশ দুরবস্থায় থাকেন। শুধু মেলা এলেই কেবল কর্মমুখর হয়ে ওঠে চিরচেনা ঐতিহ্যময় প্রাচীন এই মৃৎশিল্প সমৃদ্ধ পালপাড়াগুলো। পহেলা বৈশাখের আগে খানিকটা সময়ের জন্য হলেও মৃৎশিল্প তার হৃতগৌরব ফিরে পায় এবং মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নানা সামগ্রী তৈরিতে।

এদিকে মৃৎশিল্পীরা জানান, বিভিন্ন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দিতে না পারার কারণে মৃৎশিল্প পরিবারগুলোর এখন জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশে এই মৃৎশিল্পের চাহিদা ব্যাপক। মৃৎশিল্পের রকমারি জিনিস রফতানি করে দেশের সুনাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক দরিদ্র, বেকার নারীর কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে জীবন মানের উন্নতি ঘটবে বলেও জানান মৃৎশিল্পীরা।

এছাড়াও বেশ কয়েকটি পালপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, কেউ মাটি গুঁড়া করে কাদা করছেন, কেউ মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরণের হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করছেন, কেউবা বিভিন্ন পশুপাখির আকৃতি তৈরিতে ব্যস্ত। আবার কেউ মাটির তৈরি জিনিসপত্রে রঙ-তুলি দিয়ে হরেক রকমের নকশা করছেন। অনেকে সদ্য তৈরি পণ্যগুলো রোদে শুকাচ্ছেন। এক দল ব্যস্ত রোদে শুকানো জিনিসগুলো আগুনে পোড়ানোর কাজে। এসব কাজে স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা-মাকেও নানাভাবে সাহায্য করছে।

সুকুমার চন্দ্রপাল নামে এক মৃৎশিল্পী বলেন, আমাদের মাটির তৈরী সৌখিন সামগ্রী ও শিশুদের বিভিন্ন রকমের খেলনা রাজধানী ঢাকা,ময়মনসিংহ,জামালপুর,শেরপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে পাইকারী বিক্রেতারা কিনে নিয়ে যায়। আমরাও স্থানীয় মেলায় ও বাজারে বিক্রি করে থাকি। একটি মাটির ঘোড়া ২০ থেকে ৬০ টাকা, হরিণ ১৫ থেকে ২৫, কলসি ৬০ থেকে ২৫ টাকা, ফুলদানী ৮০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। এসব মাটির তৈরী সামগ্রী বিক্রি করে আমাদের সংসারে কিছুটা হলেও স্বচ্ছলতা ফিরে আসে।


আরও পড়ুন