ইসলামে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
মে ১, ২০১৮ ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

এস এম আরিফুল কাদের ।। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিক কাজ করা মাত্রই পারিশ্রমিক দাবি করতে পারে। চুক্তি অনুসারে প্রত্যেক শ্রমিককে যথাসময়ে পূর্ণ বেতন পরিশাধ করে দিতে হবে। অতি দ্রুত মজুরি পরিশোধের তাকীদ দেওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে হাদীস বর্ণিতও আছে। হযরত আব্দুলাহ্ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা. ইরশাদ করেছেন “শ্রমিকের পারিশ্রমিক মজুরি তার ঘাম শুকানোর পূর্বে দিয়ে দাও”। (ইবনে মাজাহ্)। নবী করীম সা. আরও বলেন, “তিন ধরনের ব্যক্তি আছে; কিয়ামতের দিন আমি যাদের দুশমন হবো। আর আমি যাদের দুশমন হবো তাকে আমি লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত করে ছাড়ব। উক্ত তিনজনের মধ্যে একজন সে যে কোনো শ্রমিককে খাটিয়ে নিজের পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়।

কিন্তু তার উচিত মজুরি প্রদান করে না” (সহিহ বুখারী) ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। কেননা শ্রমিকই হলো সকল উন্নয়ন ও উৎপাদনের চাবিকাঠি। যে জাতি যত বেশি পরিশ্রমী সে জাতি তত বেশি উন্নত। শ্রম আল্লাহ্ প্রদত্ত মানব জাতির জন্য এক অমূল্য শক্তি ও সম্পদ। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত আছে, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি করেছি” (সূরা বালাদ : আয়াত নং ৩)। কিন্তু ইসলাম বিবর্জিত বিভিন্ন সমাজে শ্রমের বিভিন্নতাকে বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়ে থাকে। তাদের দৃষ্টিতে কোনো শ্রম অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আবার কোনো কোনো শ্রম অত্যন্ত অমর্যাদাকর। সেখানে অর্থের মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যে যত অর্থশালী সামাজিকভাবে তিনিই ততই সম্মানী। যদিও ন্যায়নীতির মানদন্ডে যতই স্বচ্ছ হউক না কেন তারাই সমাজের নিকৃষ্ট ও অবহেলিত ব্যক্তি। তাই দেখা যায় জীবিকা নির্বাহে যারা কায়িক শ্রম নির্ভরশীল তারা আদি যুগের দাসদের চেয়েও হীন হয়ে পড়েছে। যে কোনো পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিকই সবচেয়ে বেশি শ্রম প্রদান করে থাকে। তাই ইসলাম শ্রমিকদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের কাজের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। আল্লাহ্ তাআলা কাজের জন্য মানুষকে নামাযের পর বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “অতঃপর নামায শেষ করে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়। আল্লাহ অনুগ্রহ অন্বেষণ করো এবং বেশি পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করো যাতে সফলকাম হতে পার” (সূরা জুম’আ : আয়াত নং ১০)।

রাসূলুল্লাহ্ সা. কথা, কাজ ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে শ্রম ও শ্রমিকদের প্রশংসা করেন। হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তি তা থেকে উত্তম আহার করেনি, যা সে নিজ হাতে উপার্জন করে খেয়েছে। (মাজমা‘উয যাওয়াইদ ওয়া মাম্বাউল ফাউয়াইদ)। হযরত মিকদাম ইবনে মাজদী কুরায়ব আয্-যুবায়দী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি নবী করীম সা. থেকে বর্ণনা করেন। নবী করীম সা. ইরশাদ করেন, “মানুষের নিকট তার চেয়ে কোনো উত্তম উপার্জন নেই, যা সে নিজের হাতে উপার্জন করে খায়। সে যা কিছু নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য ও ঘরের ভৃত্যদের জন্য খরচ করে তা সবই সাদাকা” (সহিহ বুখারী) । হযরত সা‘দ রা. কামারের কাজ করতেন, হাতুড় দিয়ে কাজ করতে করতে তার হাত দু’টি বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। একদিন নবী করীম সা. এর সাথে করমর্দন করার সময় সাদকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হাতুড় দিয়ে কাজ করতে গিয়ে এ অবস্থা হয়েছে। নবী করীম সা. তার হাত চুম্বন করে বললেন, “এ হাতকে কখনো আগুন স্পর্শ করবে না” (সহিহ বুখারী)।

ইসলাম অধীনস্ত কর্মচারী ও শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ঘোষণা করেছে। আল্লাহ্ তা’আলা শ্রমকে নিয়ামতের সাথে তুলনা করে বলেন, “যাতে তারা তার ফল আহার করে এবং তাদের হাত যা কাজ করে তা হতে; তারা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?” (সূরা ইয়াসিন, ৩৫)। শ্রমিকদের যেন মানুষ ঘৃণা না করে বরং তাদের সম্মানের চোখে দেখে সে ব্যবস্থা ইসলাম করেছে। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো পেশাই ঘৃণিত নয়। রাসূলুল্লাহ সা. খেটে খাওয়া মানুষের মর্যাদা বর্ণনা করে ঘোষণা করেন, “শ্রমিক হলো আল্লাহর বন্ধু” (কানযুল উম্মাল, ৪র্থ খণ্ড)। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির চেয়ে শ্রমিকদের মর্যাদা অধিক হিসেবে বর্ণনা করেছে।

রাসূলুল্লাহ্ সা. ঘোষণা করেন, “ঐ সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমাদের কারও পক্ষে এক গাছা রশি নিয়ে বের হওয়া এবং কার্য সংগ্রহ করে পিঠে বোঝাই করে বয়ে আনা কোনো লোকের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম। অথচ সে ব্যক্তি তাকে দান করতেও পারে অথবা তাকে বিমুখও করতে পারে” (সহিহ বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী)।

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজসহ বিভিন্ন দাবিতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভ সমাবেশে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলী চালায় পুলিশ। নিহত হন অনেক শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের আপসহীন মনোভাব ও আত্মত্যাগের ফলে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১ মে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। হযরত মুহাম্মদ সা. এর হাদিস, শ্রমিকদের সাধ্যের অতীত কাজে কখনো খাটাবে না- এ নির্দেশনামূলক কথাটির কিছু অংশ হলেও ১ মে’র আন্দোলনে প্রতিফলিত হয়। আগামী দিনে বাংলাদেশসহ বিশ্ব শ্রমিকরা নিজেদের প্রয়োজনে ইসলামের দেওয়া শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন ইনশাআল্লাহ।

লেখকঃ- নির্বাহী পরিচালক, পানাহার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রসা (প্রাইভেট), করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ।

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০১-মে২০১৮ইং/এন

Comments are closed.