শবে বরাত : আমাদের করণীয় ও বর্জনীয়

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
মে ১, ২০১৮ ২:৪৬ অপরাহ্ণ

মরিয়ম আক্তার ।। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলপ্রেমী মু’মিন ব্যক্তির জন্য প্রতিটি রাত্রই  শবে বরাত। সময়ের প্রতিটি মুহূর্তই তার কাছে মূল্যবান। কেননা রাসূল ( সা) বলেন, “প্রতিদিন ভোরবেলা দু’জন ফেরেশতা ডেকে বলেন, হে আদম সন্তান! আমি একটি নতুন দিন।  আমি তোমার কাজের সাক্ষী। তুমি আমাকে কাজে লাগাও। কেননা কিয়ামত দিবসের পূর্বে আমি আর ফিরে আসবো না”( মা’ছারুন-নাবিয়্যি( সা:)। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন: ” মহান আল্লাহ প্রতি দিন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন। তিনি বলেন – কে আমার কাছে আবেদন করবে, আমি তার আবেদন কবুল করব। কে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে দান করব। কে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা  করবো ” (বুখারী-১১৪৫ ,আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজা)।

শবে বরাত শব্দটি সরাসরি কুরআন হাদীসে কোথাও উল্লেখ  না থাকলেও হাদীসে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যা ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাত বলে পরিচিত। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মধ্য দিয়ে কেউ শবে বরাতের ফজিলতকে অস্বীকার করছে, আবার কেউ শবে বরাতকে বিভিন্ন বিদআতী আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করছে। হাদীস শরীফে এ মাসের, বিশেষত এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতের অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে । উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ( রা) বলেন, ” মহানবী    (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, রমজান মাসের পর কোন মাসের রোজা সর্বাধিক ফযিলতপূর্ণ? তিনি বলেন, রমজান মাসের সম্মানার্থে শা’বান মাসের রোজা ” (তিরমিযী)। হযরত আবু মূসা আশ’আরী(রা)থেকে বর্ণিত রাসূল বলেন, ” আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে মাফ করে দেন “( ইবনে মাজা : ১/৪৪৫ )। নাসিরুদ্দিন আলবানী (র) এর মতে হাদীসটি হাসান। (সিলসিলাতুল আহাদীস আস সহীহা: ৩/১৩৫ )।  হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত রাসূল (সা)বলেন – ” যখন মধ্য শাবানের রজনী আসে, তখন তোমরা রাতে দণ্ডায়মান থাকো এবং দিবসে সিয়াম পালন করো। কারণ, ওই দিন সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন,শোন! আছে কি কেউ আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।  আছে কি কেউ রিযিক প্রার্থনাকারী ? আমি তাকে রিযিক দান করবো । আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত ? আমি তাকে বিপদমুক্ত করব । এভাবে সুবহে ছাদিক পর্যন্ত ঘোষাণা করতে থাকেন ” ( সুনানে ইবনে মাজাহ, ১৩৮৮) ।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এক রাতে আমি মহানবী (সা) কে  বিছানায় পেলাম না। আমি তাঁর খুঁজে বের হয়ে গিয়ে তাঁকে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে পেলাম। …. মহানবী (সা) বললেন, আল্লাহ  তায়ালা শা’বান মাসের মধ্যবর্তী রাতে পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন এবং কলব গোত্রের মেষপালের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন ”
(সুনানে তিরমিযী: ২/১২১,১২২) , (মুসনাদে আহমাদ ৬/২৩৮), ( ইবন তাইমিইয়্যার ফাওজুল ক্বাদীর, ২য় খণ্ড, পৃ,৩১৭)।

এসব হাদীস দ্বারা শবে বরাতের ফযিলত প্রমাণিত হলেও সকলকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এসব ইবাদত নফল আমলের পর্যায়ভুক্ত। ইবাদত হিসেবে এ রাতে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আযকার, নফল নামাজ, দোয়া, ও  তাওবা ইস্তেগফার করা যায়। তবে তা হবে ব্যক্তিগত সমষ্টিগত  নয়। দলবদ্ধ ভাবে মসজিদে গমন করা, ফজিলত মনে করে নির্দিষ্ট কোন সুরা ১০-২০ বার করে পড়ে বিশেষ নামাজ আদায় করা,দলবদ্ধ ভাবে কবর যিয়ারত করা, আতশবাযী করা,বাসা বাড়ী আলোক সজ্জা করা বিদআত ও পরিত্যাজ্য। রাসূল (সা) বলেন- ” যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করবে যা তার মধ্যে নেই তা প্রত্যাখ্যান যোগ্য “( বুখারি ও মুসলিম)।

ক্ষমার রজনী  শবে বরাতে  আল্লাহর  ক্ষমার চাদরে সকলকে  আবৃত করার বিশেষ ঘোষনা থাকলেও  যে সকল ব্যক্তির দুআ তাওবা না করা পর্যন্ত কবুল করা হয় না  তারা হলো :  মুশরিক অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে  কোন প্রকারের শিরক করে, যে ব্যক্তি কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণকরে, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, চাই তা নিকটতম আত্মীয় হোক বা দূরবর্তী আত্মীয়, যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়,যে ব্যক্তি মদ্যপান করে অর্থাৎ নেশা করে,যে ব্যক্তি গণকগিরি করে বা গণকের কাছে গমণ করে,যে ব্যক্তি জুয়া খেলে, যে ব্যক্তি মাতা-পিতার কথা অবাধ্যতা করে এবং যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করে। তাই শবে বরাতের পূর্ণ ফযীলত ও শবে বরাতের রাতে দুআ কবুল হওয়ার জন্য আমাদের কাজ  হলো সর্ব প্রকার  কবীরা গুনাহ থেকে খাঁটি দিলে তাওবা করা।

লেখিকা : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম/০১-মে২০১৮ইং/এন

Comments are closed.

LATEST NEWS