ময়নামতি ভ্রমণে আমরা চারজন

ময়মনসিংহ টু কুমিল্লা

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
মে ১০, ২০১৮ ১২:৫৮ অপরাহ্ণ
ফারুক উমর ।। দিনটি ছিল ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬। কোন এক বিশেষ প্রয়োজনে জন্য গিয়েছিলাম ময়মনসিংহ। কাজটি সম্পূর্ণ হবার পর দেখা করার জন্য বড় ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলাম। (জহিরুল)ভাই ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে  লেখাপড়া করে এবং আবাসিক হলে থাকেন। আমি রাতে তার রুমে শুয়ে আছি এবং পাশে বড় ভাইয়ের দুই বন্ধু (আনেয়ার ও আলিম)ভাইদের সাথে গল্প করছি।  তারাও ময়মনসিংহ পলিটেকনিক  ইন্সটিটিউটে লেখাপড়া করে।
 হঠাৎ!ভাই রুমে এসে আমাদের বলল চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি, এখন তো তেমন লেখাপড়ার চাপ নেই, আর পরবর্তীতে আরও সময় পাব না। মনে মনে ভাবলাম আমারও তেমন কোন কাজ নেই, তাও বছরের শেষ দিকে।আমি খুব ভ্রমন পিয়াসু। ভাই বলল কোথায় যাওয়া যায়, আমি বলে উঠলাম চলেন কুমিল্লা থেকে ঘুরে আসি।” অপার সৌন্দর্যের নগরী  কুমিল্লা”। ভাইয়ের অন্যান্য জায়গা কথা বললেও অবশেষে যোগাযোগব্যবস্থা, টাকা, পরিবেশ ও সময়গত দিক বিবেচনা করে কুমিল্লা যাওয়ার জন্য সবাই রাজি হল।
কিন্তু কুমিল্লা পরিচিত কেও নেই মহা বিপদ,গিয়ে থাকব কোথায়,আর কুমিল্লা পরিচিত কেও না থাকলে বিভিন্ন সমস্যা যদি পড়ি তখন?  হঠাৎ! মনে হল আমার এলাকার পরিচিত বড় ভাই আছেন (জয়নাল আবেদিন)কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় “ইংরেজি সাহিত্য” পড়ে,সেখানে গেলে এক ব্যবস্থা হবেই ইনশাআল্লাহ। সবাই বসে পরিকল্পনা করলাম সকালের ট্রেনেই কুমিল্লা যাচ্ছি, আমার ভাবতেই অবাক লাগছে, একদিনের পরিকল্পনা ফলশ্রুতিতে ময়নামতি যাচ্ছি!
আমরা সবাই কাপড়চোপড়, হালকা খাবার, ও প্রয়োজনীয়  মালপত্র রাতেই গুছিয়ে নিলাম। রাতে আর ঘুম নেই, কখন যাব।এর আগে কোনদিন এতদূর ভ্রমনের সুযোগ হয়ে ওঠেনি পড়াশোনা চাপ থাকায়।তাই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না, ভোর ৪টা মোবাইলে এর্লাম দিয়ে রাখলাম যাতে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি জেগে উঠতে পারি। ভোর ৪টা সময়  উঠে ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে।সকাল ৭টা ট্রেন ছাড়বে ময়মনসিংহ টু চট্টগ্রাম। বলে রাখি এর আগে আমার কখনও ট্রেনে ভ্রমন করা হয়নি।প্রথমবার মত উঠে বসলাম বগিতে।পুরাই অন্যরকম অনুভূতি, বলে বুঝাতে পারবনা।ট্রেন আস্তে আস্তে চলছে, মাঝে মাঝে স্টেশনে থামে বিরক্তিকর হলেও সেটা আমার কাছে মনে হয়নি প্রথমবার বলে কথা!
ট্রেনে ভাইদের সাথে নানা গল্প গুজব,হাসি ও অচেনা মানুষগুলোর সাথে কথা বলা অভিজ্ঞতা যেন ভালই হয়েছিল।  যাত্রা মাঝ পথে গিয়ে বড় ভাইকে ফোন দিলাম আমরা আসতেছি কুমিল্লা, ভাই বলল কোন সমস্যা নেই, চলে এসে । তখন আবার ভার্সিটিতে শীত কালীন বন্ধ চলছে। ভাই সব ঠিকানা বলে দিলেন কোথায় নামতে হবে এবং কিভাবে তার কাছে যাব। বিকেল ৫টা সময় আমরা কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন নামলাম।আহ্ খ্যাতনামা কুমিল্লা”। স্টেশন থেকে নেমে আমরা হালকা কিছু  খেয়ে নিলাম,হাটঁতে হাটঁতে দৌলতপুর মোড়ে এসে সিএনজি নিয়ে সেখান থেকে সোজা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। এসে ভাইকে ফোন দিলাম, ভাই টিউশনিতে আছেন,আমাদের (কাজী নজরুল ইসলাম হল) তার রুমে যেতে বলল। আমরা রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এক বড় ভাইকে নিয়ে সন্ধ্যায় বেড়িয়ে পরলাম,  পাহাড় ঘেরা ক্যাম্পাস ঘুরতে। আমার খুব আনন্দ লাগছিল, এটা কি বিশ্ববিদ্যালয়? বাহ্! চারদিকে পাহাড়, সবুজের সমারোহ, অসাধারণ পরিবেশ, এক কথায় মনছোঁয়ে  যাওয়ার মত মন মুগ্ধকর ক্যাম্পাস । হঠাৎ! ভাইয়ের ফোন আসল, তিনি টিউশনি শেষ করে ক্যাম্পাসে এসেছেন,আমরা তার কাছে গেলাম দেখা করার জন্য। ভাই তো অনেক খুশি হয়েছেন আমাদের দেখে তারপর একসাথে বসে চা খেলাম।তারপর রুমে গিয়ে ভাইয়ের বন্ধুদের সাথে পরিচিত হলাম। আমরা বাহিরে থেকে হালকা বিস্কিট, পাউরুটি কিনে রেখেছিলাম রাতে সবাই মিলে সেগুলো ভক্ষণ করলাম । ভাই আমাদের বলল তোদের মাঝে কে খেজুঁর গাছে উঠতে পারিস, বললাম কেন ভাই? আমি গাছে উঠতে পারি।বলল খেজুর রস খাবিনা, আমি বললাম ছোট্টবেলা চুরি করে ষ খেজুরের রস খাওয়ার অভ্যাস আছে,এবারও মিস দেওয়া যাবেনা।রস বহন করার পাতিল নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম খেজুঁরের গাছ থেকে রস পারার জন্য। তখন ভার্সিটি বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাস পুরো ফাকাঁ। বেড়িয়ে পরলাম দেখি পুরো ক্যাম্পাস জুঁড়ে পাহাড় আর খেজুঁর গাছে ভরা, খেজুঁর রস যাতে কেও না পারে সেজন্য পহরি রয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস পাহাড় ঘেরা জঙ্গল ঘুরেও রস সংগ্রহ করতে পারলামনা কারণ পহরি আগেই রস পেরে নিয়েছিল। ভাই একজন পহরিকে বলল, রস পারতে  দিতে, পহরি রাজি হল না,  তারপর ভাই টাকা দিতে আনুমানিক  চার কেজি মত রস কিনেছিল।  সে রস রুমে এসে সবাই মিলে খেলাম, সে কি আনন্দ বলে বুঝাতে পারবনা।এখনও আমি বন্ধুদের কাছে সেই রাতের কথা বলি।আর কখনও ভুলতেও পারবনা সেই রাতের কথা। সেদিন আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ব্যবহার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া কতটা গর্ব বিষয়। তারপর ভাই  ও ভাইয়ের বন্ধুরা আমাদের কুমিল্লা দর্শনীয় স্থানগুলো কথা বলল।আমরা তো চিনিনা কিছু সেজন্য জায়গাগুলো সম্পর্কে জেনে নিলাম। রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম।খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছি, তখন শীতকাল, চারদিক  কুয়াশা ডেকে রয়েছে, ফ্রেশ হয়ে শীতকে উপেক্ষা করে আমরা চারজন ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম।অনেক জায়গা , সব গুলো জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে হবে। হাতে সময়ও খুব কম।ভার্সিটি ক্যাম্পাস রোড দিয়ে চলে এলাম জাদুগরে,টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম, জাদুগরে ভিতরে চোখে পড়ল প্রাচীন আমলের পুরাতন প্রত্নতত্ত্ব, হাড়ি, পুতুল,  জীবজন্তু মূর্তি,দেবদেবী মূর্তি, নানা প্রাচীন মানুষের ব্যবহৃত জিনিস পত্র, এসব জাদুগর মানুষকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে প্রাচীন ইতিহাস জানাতে খুবই সহযোগী হিসেবে কাজ করে। জাদুগরের ঠিক পাশেই “ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার”। সবসময় বইয়ের পাতায় দেখে এসেছি, এখন বাস্তবিক ভাবে দেখছি, ভাবতেই অবাক লাগছে!
Related image
কুমিল্লা ময়নামতি লালমাই পাহাড় মাঝখানে অবস্থিত শালবনবিহার প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে এখানে একটি বৌদ্ধবিহার সন্ধান পাওয়া যায়।ময়নামতি খনন করে পাওয়া বিহারটি দেব বংশের চতুর্থ রাজা ভবদেব কর্তৃক ৭ম শতাব্দী শুরু দিকে নির্মিত হয়েছে।এর মূল নাম ভবদেব বিহার।জানা যায় একসময় জায়গাটি শালবন রাজার বাড়ী  নামে পরিচিত ছিল বলে খননের নাম করা হয় শালবন বিহার।এছাড়া রয়েছে রুপবান মুড়া, ও ইটা খোলা মুড়া প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। চারদিক কি মনোরম পরিবেশ পর্যটকদের মনকে সহজেই জয় করে নিতে পারে। বিহারের চারদিক ফুলের বাগান যা বিহারের সৌন্দর্য মাত্রাকে আরো দ্বিগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। মনে হয়েছে বইয়ের পাতার দেখে পড়া ও বাস্তবিক দেখে শিক্ষা নেয়ার মধ্যে  বিস্তর তফাৎ রয়েছে। বিহারের বিপরীত অবস্থান করছে বিশাল “বৌদ্ধ মন্দির” সেটা অনেক দূর থেকে দেখা যায়। মন্দিরটি ঠিক রাস্তার পাশেই। দর্শনার্থীদের দর্শনের মাত্রাটা আরো বেশী কৌতুহলময় করে তুলে।
বিহার থেকে বেড়িয়ে চলে গেলাম, “স্বপ্নচূড়া” নামে এক বিশাল পাহাড়ে, হাটঁতে হাটঁতে খুবই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম, পাহাড়ে উঠে দেখি চারদিক পাহাড়ঘেরা সবুজ পরিবেশ, আমি তো অবাক, এত সুন্দর জায়গা হয় নাকি। পাহাড়ে পাদদেশে হোটেল,পার্ক রয়েছে,দর্শনার্থীরা অনায়েসে সেখানে পিকনিক,থাকা কিংবা নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে সেরকম ব্যবস্থা আছে।পাহাড় থেকে নেমে হালকা খাবার খেয়ে নিলাম এখনও অনেক জায়গা দেখতে বাকী রয়েছে।একটা সিএনজি নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম, রাস্তার পাশে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ চোখে পড়ল, সেখান থেকে একটু এগুলেই কুমিল্লা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট।
কোটবাড়ী বড় ভাইয়ের একজন পরিচিত বন্ধু এসে আমাদের তার বাসায় নিয়ে গেলেন।সেখানে ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে বিকেলে আবার বেড়িয়ে পরলাম সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম কুমিল্লা বিখ্যাত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বার্ড) , এটি ১৯৫৮ সালে আখতার হামিদ খান গড়ে তুলেছিল পল্লী মানুষের আর্থিক সহায়তা প্রদান করার লক্ষ্য নিয়ে। ভিতরে পরিবেশ দেখে যে কেও অবাক হবে। এটি কুমিল্লা নামকে সমৃদ্ধশালী ও সৌন্দর্যের মাত্রাকে দ্বিগুন বৃদ্ধি করেছে। তারপর চলে গেলাম “কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ”। এটি দেশের অন্যতম সেরা কলেজ।
মূল গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই বঙ্গবন্ধু প্রতিকৃতি, যা কলেজের সৌন্দর্যের মাত্রাকে আরো বৃদ্ধি করেছে।তখন আমার মনে হয়েছে  কুমিল্লা অন্যান্য জেলার থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেকাংশে এগিয়ে।আমাদের ট্রেন রাত ৮টায়, তাই হাতে প্রচুর সময় আছে, ভাবলাম কুমিল্লা তো রসমালাই জন্য বিখ্যাত, এখানে এসেছি কিন্তু রসমালাই খাওয়া হবেনা?  এটা কি করে হয়।চলে গেলাম “কান্দিরপাড়” বাহ্ কি সুন্দর শহর, চারদিকে বড় বড় শপিংমল,অসাধারণ দালানকোঠা ও পরিস্কার নগরী যেন কুমিল্লা নামকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।আমরা চারজন মিলে শহরকে ঘুরে দেখলাম,পরে রসমালাই কিনে হোটেলে বসে খেলাম।বাহ্! কি মিষ্টি অর্ধেক খেয়েই আর খাওয়া যায়না। আমরা কুমিল্লা রেলস্টেশন এসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।সারাদিন ঘোরাঘুরি তো অনেক হয়েছে সবাই ক্লান্ত। রাত ৮টা সময় ট্রেন আসল,আমরা উঠে পরলাম। কুমিল্লা ভ্রমনের ইতি ঘটিয়ে রওনা দিলাম ময়মনসিংহ পথে। রাতে চারদিকে কি মনোরম সৌন্দর্য ভারতের ত্রিপুরা সীমন্তের  বাতিগুলো আলো ঝিকঝিক করে উজ্বলিত হচ্ছিল। সকাল ৫টা এসে ট্রেন ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে এসে থামল।আমরা নেমে পড়লাম। এবং শেষ করলাম কুমিল্লা স্মৃতিময় ভ্রমনটি। সত্যিই কুমিল্লা ভ্রমন আমার মনে সারাজীবন  স্মৃতিপটে অঙ্কিত থাকবে।সময় পেলে আবার ছুঁটে যাব ঐই সৌন্দর্যের নগরীতে।

 

Comments are closed.

LATEST NEWS
ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ছাত্র ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্টের গোড়াতেই গলদ : কাদের একাদশ সংসদ নির্বাচন : প্রাথমিকের বার্ষিক পরীক্ষা এগিয়ে নেয়ার নির্দেশ মোহাম্মদ বিন সালমানকে তার পদ থেকে সরানো হচ্ছে জাকারবার্গকে ফেসবুকের চেয়ারম্যান থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব! আ.লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যায় : গণপূর্ত মন্ত্রী যশোদলে মরহুম আঃ হামিদ গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন শোলাকিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসপাতালের থেকে লাফ দিয়ে নবজাতকসহ প্রবাসীর স্ত্রীর আত্নহত্যা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা জানুয়ারিতে অশুভ শক্তি রুখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে: রাষ্ট্রপতি