গোনাহের প্রতিষেধক তওবা

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
মে ১৭, ২০১৮ ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

এসএম আরিফুল কাদের ।। তওবা অর্থ হচ্ছে পাপ থেকে বিরত থাকার এমন প্রতিজ্ঞা করা, যা ভবিষ্যতে আর না হয় এবং মহান প্রভুর দিকে যাবতীয় পাপসমূহ থেকে পাক-সাফ হয়ে প্রত্যাবর্তন। সর্বজনীন স্বীকৃত যে, মানুষ অপরাধ ও দোষপ্রবণ। সেজন্যই নফসেকে খুশি করতে শুরু করে আল্লাহর দেয়া বিধানাবলির অমান্যতা। যার কারণে মৃত্যু পর থেকেই ভোগ করতে হয় জাহান্নামের শাস্তি। তাই আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তুষ্টি পেতে প্রয়োজন খালেসভাবে তওবা তথা অনুশোচনা করা। যা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর অবশ্য কর্তব্য। কোরআনের ভাষায় “তোমরা মহান প্রভুর কাছে তওবা কর, এমন তওবা যা আন্তরিকভাবে হবে”। [সূরা তাহরীম: আয়াত নং ৮]

কিন্তু তওবা করার পর যদি আবার গোনাহে লিপ্ত হয় তাহলে কি পূর্বের তওবার মর্যাদা থাকল? না। ঠিক তা নয়! যদি কোন ব্যক্তি একশতবার গোনাহ করে এবং একশতবার তওবা করে তবুও তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। এমনকি মানবজাতি যেন বিপদগামী না হয়, সেজন্য আল্লাহ পাক তাদেরকে আহ্বান করে বলছেন- “তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা মহান আল্লাহকে ভুলে গেছে”। [সূরা হাশর ঃ আয়াত নং ১৯]

এ ব্যাপারে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- “অবশ্যই তওবাকারী আল্লাহ পাকের প্রিয় পাত্র এবং গোনাহ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী গোনাহ শূণ্য ব্যক্তির ন্যায়”। [ইবনে মাজাহ ঃ কিতাবুয যুহদ, তওবা অধ্যায় হাদিস নং ৪০৩৪] কবির ভাষায়- “খোদার পথে প্রেমের রথে ফিরে এসো, ফিরে এসো, শতের অধিক তওবা করেও ফিরে এসো, ফিরে এসো কাজ ও কথার বিশ^ মাঝে ভাঙ্গোও যদি অঙ্গিকার ফিরে এসো নাদেম হয়ে থাকবে খোলা সেই দুয়ার”। [তওবাতুন নাছুহা ঃ পৃ. নং ১৪]

সেই তওবার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে- জাহান্নামের আজাব থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং মাওলা পাকের দীদার লাভ করা। তাই আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন”। [সূরা বাকারা ঃ আয়াত নং ২২২] শুধু তাই নয় বরং পাপসমূহ মুছে তদস্থলে নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেন।

কোরআনের ভাষায়- “আল্লাহ তাঁদের (তওবাকারীদের) গোনাহসমূহকে ক্ষমা করে পূণ্যের দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন”। [সূরা ফুরকান ঃ আয়াত নং ৭] তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তওবা করার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “আমার অন্তরে কখনো কখনো গোনাহের কালো মেঘ ছেয়ে যায়। যার দরুন আমি আল্লাহর দরবারে প্রত্যেহ একশতবার তওবা করি”। [সহিহ মুসলিম ঃহাদিস নং ২৭০২] যাকে আল্লাহ পাক সামনের ও পিছনের সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তিনি প্রত্যেহ একশতবার তওবা করেন। সে অনুযায়ী আমাদেরও উচিত গোনাহ করে তাৎক্ষনিক অনুশোচনা বা তওবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। দুনিয়ার জীবনে গোনাহের কালো ছায়া কলবে আসা স্বাভাবিক বলেই তওবা করা অপরিহার্য।

তাই বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথ অনুযায়ী দৈনিক তওবাই গোনাহের প্রতিষেধক। পাপ করে তওবা করলে ক্ষমা হতে পারে। কিন্তু সেই তওবা কবুল হওয়ার কিছু শর্তাবলিও রয়েছে। যেমন কোন ব্যক্তি মুখে বলল যে, আমি পাপসমূহ থেকে তওবা করলাম। কিন্তু তার অন্তর এদিকে পূর্ণ সমর্পন করল না, তাকে তওবাকারী বলা যেতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে নিজেকে শুদ্ধ(তওবা) করবে ”। [সূরা শামস্ আয়াত নং ৯] অপর আয়াতে ইরশাদ করেন- “নিশ্চয়ই সফলতা পাবে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাঁর নাম স্মরণ করে অতঃপর নামাজ আদায় করে”। [সূরা আ’লা আয়াত নং ১৪-১৫] তাই আমাদের উচিত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে পরিষ্কার কলব নিয়ে মৃত্যু বরণ করা। দৃঢ়তার সাথে তওবা করার ফলে তা কবুল হল কি না, সে বিষয়ে ইমাম গাজ্জালী র. বর্ণনা করেন- কোন এক বুযুর্গ ব্যক্তিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো।

উত্তরে তিনি বললেন, তা কবুলের কোন নিশ্চয়তায় যদিও বলা যায় না, তবুও তওবা কবুল হওয়ার কিছু আলামত রয়েছে, তা লক্ষ্য করা যেতে পারে। যেমন- তওবা করার পর বান্দা সর্বদা পাপমুক্ত থাকতে চেষ্টা করবে। অন্তঃকরণ আধ্যাত্মিক রোগ থেকে বিরত রাখবে। সৎ ও বুযুর্গ ব্যক্তির সংশ্রবে থাকবে। অসৎ, অন্যায়, পাপযুক্ত পরিবেশ থেকে বিরত থাকবে। দুনিয়ার স্বল্প পরিমান সম্পদকে যথেষ্ট মনে করবে। আখিরাতের জন্য প্রচুর আমলকে সামান্য মনে করবে। স্বীয় অন্তরকে আল্লাহর ইবাদতে রাখবে। স্বীয় রসনাকে পাপযুক্ত কথা থেকে অবশ্য বিরত রাখবে। অতীত জীবনের পাপের কথা স্মরণ করে অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে মাওলা পাকের দরবারে কান্নাকাটি করবে। [মুকাশাফাতুল কুলুব ঃ পৃ. নং ৭৪]

লেখকঃ- নির্বাহি পরিচালক, পানাহার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা (প্রাইভেট), করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ।

 

Comments are closed.