বিখ্যাত দার্শনিক আল-গাজ্জালির জীবনকথা

Muktijoddhar Kantho , Muktijoddhar Kantho
মে ২৮, ২০১৮ ৩:৫৯ অপরাহ্ণ

এসএম আরিফুল কাদের : প্রত্যেক যুগেই পথহারা মানুষদের সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য ঐশীজ্ঞান সমৃদ্ধ এক বা একাধিক মনীষীর আবির্ভাব ঘটে এ ধরাতে। তারা নবী বা রাসুল নন; বরং বিশ্বনবী (সা.) এর নির্দেশিত পথে এবং তারই আদর্শের দিকে আহবান করেন মানবজাতিকে। তাদেরই একজন ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক ও যুক্তিবিদ আল গায্যালী। তার পুরো নাম আবু হামেদ মোহাম্মদ আল গায্যালী। তবে তিনি ‘ইমাম গায্যালী’ নামেই খ্যাতি লাভ করেছেন। ‘গায্যাল’ শব্দের অর্থ সূতা কাটা। এটা তার বংশগত উপাধি। কারো মতে, পিতা মোহাম্মদ কিংবা পূর্ব পুরুষগণ সূতার ব্যবসা করতেন। তাই তাকে এ উপাধি দেওয়া হয়েছে।

তিনি ১০৫৮খ্রিস্টাব্দে ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত ‘তুস’ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন এবং শৈশবেই তিনি পিতাকে হারান। তবে পিতার মৃত্যুতে তিনি নিদারুণ অসহায় অবস্থায় পড়েও সাহস হারাননি। জ্ঞান লাভের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তাই তৎকালীন বিখ্যাত আলেম হযরত আহমদ ইবনে মুহাম্মদ বারকানী এবং হযরত আবু নসর ঈসমাইলের নিকট তিনি কোরআন, হাদীস, ফিক্হ ও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু তাতে অতৃপ্ত হয়ে জ্ঞান অন্বেষণে পাগলের মতো ছুটে যান তৎকালীন দুনিয়ার প্রধান বিদ্যাপীঠ বাগদাদের নিযামিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল মালিক র. এর নিকট ইসলামী দর্শন ও আইন বিবিধ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। ইমাম গায্যালী (রহ.) ছিলেন লেখালেখি ও ভ্রমণপ্রেমী মানুষ। মাত্র ৩৪বছর বয়সে নিযামিয়া মাদরাসার রেক্টর নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন এ পদের জন্য নিযুক্ত সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষাবিদ। ধর্ম-দর্শনে তার ছিল প্রভূত জ্ঞান। ধর্ম ও যুক্তির নিজ নিজ বলয় তিনি নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘আত্মা কখনও ধ্বংস হয় না কিন্তু দেহ ধ্বংস হয়’। আত্মা মৃত্যুর পর জীবিত থাকে। হৃদপিণ্ডের সাথে আত্মার কোনো সম্পর্ক নেই। হৃদপি- একটি মাংসপি- মাত্র। মৃত্যুর পরও দেহে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে। কিন্তু আত্মা মৃত দেহে অবশিষ্ট থাকে না। মৃত্যুর পর আত্মার পরিপূর্ণ উৎকর্ষ ও মুক্তি সম্ভবপর হয়ে থাকে’। গ্রীক দর্শনের প্রভাব ইসলামী দর্শনের উপর রেখাপাত করে রেখেছিল।

এমনকি ইসলামী দর্শন হয়ে পড়েছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য ইমাম গায্যালী নর. কলম হাতে নেন। তিনিই সেই সময় দর্শনের মর্ম মূলে ঝাঁকুনি সৃষ্টি করেন। ‘মাকাসেদুল ফালাসেফা’, ‘তাহাফাতুল ফালাসেফা’ গ্রন্থদ্বয়ে বিশ্লেষণ মূলকভাবে যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা এবং প্রকৃতি বিদ্যা সারসংক্ষেপ পেশ করেন। এমনকি পূর্ণ নিরপেক্ষতার সাথে দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গিরও সমালোচনা লিপিবদ্ধ করেন। অংকশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। এ সম্পর্কে তাঁর বিশেষ বিষয় ছিল ম্যাজিক স্কোয়ার। সাবিত ইবনে কোরা ও ইমাম গাজ্জালী র. ব্যতীত অন্য কেউ ম্যাকিজ স্কোয়ার মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের মনযোগ আকৃষ্ট করতে পারে নি। তিনি নক্ষত্রাদির গতি ও প্রকৃতি সম্বন্ধে দু’টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সম্ভবতঃ তাঁর এ গ্রন্থ দু’টি আজ বিলুপ্তি প্রায়।

এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বিষয়ে চার সহস্রাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দিতে ইউরোপে অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর প্রণীত গ্রন্থাবলির মধ্যে

উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ১. এহইয়ায়ে উলুমিদ্দীন। ২. কিমিয়ায়ে সাআ’দাত। ৩. কিতাবুল মনফিদলিন আদ দালাল। ৪. কিতাবুত তাকাফাতুল কালাসিফা। ৫. মিশকাতুল আনোয়ার। ৬. ইয়াক্কুত্তাবলিগ। ৭. মনখুল প্রভৃতি গ্রন্থ সমগ্র ইউরোপ সমাদ্রিত হয় এবং আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এ মহা মনীষী ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ইসলামের এক নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি ১১১১ খ্রিস্টাব্দের ৫০৫ হিজরী মোতাবেক সোমবার দিন ৫৫বছর বয়সে এ নশ^র পৃথিবী ত্যাগ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। বিশ^বিখ্যাত এ মনীষী চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন মুসলিম জাহানে।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পানাহার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ।

 

Comments are closed.

LATEST NEWS