অসুস্থ মা পড়ে থাকে রাস্তায় খোঁজ রাখে না সন্তানরা!

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
জুলাই ২, ২০১৮ ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

বগুড়া অফিস ।। পিতা-মাতার ভরন পোষনের আইন আছে কী? আর থাকলেও এর কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন? প্রশ্ন জনগণের।

সবাই তাকে সোবহানের মা বলেই ডেকে থাকেন। বয়স অনুমান ৬০ বছর। এই বৃদ্ধ মায়ের নাম কেউ বলতে পারলেন না। তিনি মানসিক রোগী। প্রায় দেড় যুগ ধরে চিকিৎসার অভাবে এবং খাবার না পেয়ে পড়ে থাকেন রাস্তায় নর্দমায়। এই বৃদ্ধার সন্তান থাকলেও তারা মাকে স্বীকার করে না। কখনো কখনো যাত্রী ছাউনিতে ঠাঁই হচ্ছে এই মায়ের। বস্ত্রহীন মানসিক রোগী এই বৃদ্ধা উপজেলা প্রশাসন অথবা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নজরে পড়েনি। সন্তানদের অবহেলায় একটি রুটি খেয়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকেন সোবহানের মা নামের বৃদ্ধ জননী।

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা সদরের স্থানীয় বাসস্ট্যান্ডে এই চিত্র প্রতিদিনের রুটিনে পরিনত। স্থানীয় লোকজনের দয়া হলে পাঁচ টাকার একটি রুটি কিনে দেয়। সেই রুটির অর্ধেকটাও খেতে পারেন না ওই বৃদ্ধা। বয়স বেড়েছে, চিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন তিনি। তারপরেও দেখতে আসেনি পাষন্ড সন্তান। স্থানীয়রা জানান, তিনি নন্দীগ্রাম পৌর শহরের মাঝগ্রাম মসজিদ পাড়ার মৃত মুক্তাল মিস্ত্রির স্ত্রী এবং নাজমুল হুদা নামের এক পাষন্ড ছেলের মা। নাজমুল প্রভাবশালী একটি জাতীয় দৈনিকের উপজেলা প্রতিনিধির পরিচয় দেয়।
পিতা-মাতার ভরন পোষনের আইন আছে কী ? আর থাকলেও এর কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন ? প্রশ্ন স্থানীয়দের।

জেলার শাহাজানপুরের শাকপালা এলাকার শফিকুল ইসলাম শফিক নামের এক সিএনজি চালক জানান, আমি রাতের বেলায় সিএনজি চালাই। সোমবার ভোর ৪টার দিকে নন্দীগ্রাম শহরে ভাড়া নিয়ে যাই। যাত্রী ছাউনির মেঝেতে একটি বৃদ্ধ মা অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃদ্ধা মায়ের শরীরে কাপড় ছিল না, তিনি ঠান্ডায় কাঁপছিলেন। আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। সিএনজিতে সবসময় একটি কম্বল রাখি। আমি ছুটে গিয়ে কম্বলটি এনে ওই মাকে দিয়েছি। খাবার কিনে দিয়েছি। পড়ে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওই বৃদ্ধ মাকে সবাই নন্দীগ্রাম পৌরসভার মাঝগ্রাম এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হুদার মা বলেই জানেন। সন্তান তাকে মা বলে স্বীকার করে না। সাংবাদিকদের তথ্য এনে দেয়ার কাজ করে এই নাজমুল। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও সে উপজেলা প্রশাসন এবং থানা প্রশাসনের নামে দালালী করে অনেক টাকা রোজগার করে। নাজমুল একটি জাতীয় দৈনিকের উপজেলা প্রতিনিধির পরিচয়ও দিয়ে থাকেন। থানায় কেউ অভিযোগ করতে গেলে নাজমুল হুদা তদবিরের নামেও টাকা নেয়। অথচ নিজের মায়ের চিকিৎসা তো দূরেরকথা, মাকে স্বীকার পর্যন্ত করে না। সিএনাজি চালক শফিক ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, নাজমুলের মা মানসিক রোগী। সম্প্রতি তার চিকিৎসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আলহাজ্ব শমসের আলী। নন্দীগ্রাম বনিক সমিতির সহায়তায় ও শমসের আলীর প্রচেষ্টায় নাজমুলের মায়ের চিকিৎসা করায়। কিছুদিন পর ওষুধ না পেয়ে এবং দেখাশোনার অভাবে আবারো মানসিক রোগীর রুপ নিয়েছে। পূর্বের মতই রাস্তায় নর্দমায় ঠাঁই হচ্ছে এই বৃদ্ধ মায়ের। গণমাধ্যমকর্মীরা বলেন, নাজমুল বিভিন্ন সময় নিজেকে প্রেসক্লাব সভাপতি দাবি করে অনৈতিক কার্যক্রম করে। অথচ তার কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের কর্তাদের অনেকবার বলা সত্বেও তারা হস্তক্ষেপ করেনি।
নন্দীগ্রাম থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, আমি এই থানায় যোগদানের পরেই বিষয়টি জেনেছি। আমি আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অসহায় মানুষকে সহায়তা করি। বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসার জন্য কেউ উদ্যোগ নিলে আমার সর্বত্মক সহযোগিতা থাকবে।

এ প্রসঙ্গে নন্দীগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মন্ডল জানান, বিষয়টি তাদের নজরে আছে। অনেক বার এ নিয়ে সন্তানদের সাথে কথা হয়েছে। তারা বরাবরেই তাদের মা কে অস্বীকার করে আসছে। নূন্যতম মানবিকতাও তাদের মধ্যে নেই। প্রশাসনকে তিনি অনুরোধ করেছেন বিষয়টি আমলে নেয়ার জন্য।

Comments are closed.