কোটা সংস্কার আন্দোলনের ময়নাতদন্ত

ডেস্ক রিপোর্ট , মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ
জুলাই ১০, ২০১৮ ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠে শাহবাগ সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রথমে আন্দোলন ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও ধীরে ধীরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে শাহবাগ সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে সারাদেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার আশ্বাস দিলেও রহস্যজনক কারনে বিভিন্ন ইস্যু ও গুজবকে পুঁজি করে কতিপয় ছাত্র এই আন্দোলন চলমান রাখে।

মূলত এ আন্দোলনটি মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে ছাত্র শিবিরের ব্যানারে ১৯৯৬ সালে শুরু হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নত্যাগে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা বিরোধী ছাত্র শিবিরের আন্দোলন তখন সফলতা পায়নি। পর্যায়ক্রমে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সালে এসে এ আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলনে রুপ লাভ করে। তবে আন্দোলনের পেছনে মূল টার্গেট রয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা কোটা। আন্দোলনের মূল হোতারা দীর্ঘ ২২ বছরে সাধারণ মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের ছাত্র ছাত্রীদের “কোটার জন্য চাকরি হচ্ছে না, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা” এই বলে ব্রেইন ওয়াশ দিতে থাকে। যার ফসল আমরা দেখলাম ২০১৮ সালের এই আন্দোলনে।

বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর বাঙ্গালী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আন্দোলনকারীরা জাতির পিতার ছবি হাতে নিয়ে “বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই” এই স্লোগানে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে; তাদের অপমানিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান ধরনের কটুক্তি করেছে। আন্দোলনের এই পলিসি থেকে নিশ্চিত বলা যায় স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি জাতির সাথে রসিকতা করেছে। অথচ ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা হত্যার পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আত্নত্যাগে অর্জিত স্বাধীন দেশে নিজের পরিচয় দিতে পারেনি, দূর্বিসহ জীবনযাপন করেছে। তখন দেশ ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির দখলে।

আন্দোলনের মূল হোতাদের লক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংকুচিত বা বিলুপ্ত করা। তাতে বাঙ্গালী জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা অপমানিত হবে, এতে ৭১ এর পরাজিত শক্তি জামাত-শিবির-রাজাকারদের বিজয় হবে, সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একটা বিদ্বেষ সৃষ্টি হবে এবং আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বানচাল করে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার উচ্ছেদ করতে পারলেই তাদের এই আন্দোলন সফল।

আন্দোলনের মূল হোতারা জানে বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ সরকার। এ সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা সম্ভব না। তাই কোটা বিলুপ্তির পর নিশ্চিত চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রসমাজের সমর্থন আদায় করে অনায়াসে এ আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে রুপলাভ করা সম্ভব।

সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের আবেগকে পুঁজি করে বিভিন্ন অপপ্রচার, মিথ্যা গুজব এবং ফেইসবুক লাইভে এসে ছাত্র ছাত্রীদের উসকে দেয়ার মাধ্যমে বর্তমানে চলছে এ আন্দোলন। যেমন :

  • ভিসির বাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং তাকে হত্যা চেষ্টা।
  • পুলিশের গুলিতে নিহত এক ছাত্র এবং এই খবর ভাইরাল হওয়ার কয়েক ঘন্টা পর সেই ছাত্র নিজেই বিবৃতি দেন তিনি বেচেঁ আছেন, এটা সম্পূর্ণ গুজব।
  • সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বক্তব্যে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে রাজাকারের বাচ্চা বলে সম্বোধন করেছিলেন কিন্তু তার সম্পূর্ণ বক্তব্য থেকে কেটে কয়েক সেকেন্ডের একটা ভিডিও ভাইরাল করে উসকে দেয়া হয় তিনি সকল ছাত্র সমাজকে রাজাকারের বাচ্চা বলেছেন।
  • ঢাবির কবি সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগ নেত্রী এশা এক ছাত্রীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে সাধারণ ছাত্রীদের দ্বারা এশাকে মারধোর ও শ্লীলতাহানি করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত সেই ছাত্রী এক ভিডিও বার্তায় নিজেই জানান দেন রাগের মাথায় দরজায় লাথি দিতে গিয়ে তার পা কেটে যায়।
  • ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে প্রচার হয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের এক শিক্ষকের ফোনালাপ। সেখানে তারেক রহমান সরাসরি এই আন্দোলনকে উসকে দেয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহবান জানান।
  • কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ন আহ্বায়ক রাশেদ খানের ফেইসবুকে শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া যায় এবং ৭১ টিভিতে লাইভে তাকে এব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে সে কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
  • জামায়াত-শিবির যেহেতু রাজাকারদের সংগঠন তাই রাজাকারের মতো ঘৃণিত শব্দ সাধারণ ছাত্রদের আবেগে প্রবেশ করিয়ে তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ও প্ল্যাকার্ডে আমি রাজাকার লিখে মিছিল করা হয়।
  • কোটা আন্দোলনের আরেক যুগ্ন আহ্বায়ক নূরুল হক নূরু বাশের কেল্লা নামক ফেইসবুক পেইজ থেকে লাইভে গিয়ে ছাত্রসমাজকে উসকে দিতে দেখা যায়। বাশের কেল্লা মূলত জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত ফেইসবুক পেইজ যা দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে।

এছাড়াও বিভিন্ন ফেইসবুক পেইজ, গ্রুপ, ফেইক আইডি থেকে কোটা বিরোধী গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে বর্তমানে টিকে আছে এ আন্দোলন।

উল্লেখিত কারণগুলির জন্য সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের মনে প্রশ্ন জাগেনা? তাদের কি একবারও জানতে ইচ্ছে করেনা এই আন্দোলন পরিচালনার জন্য এক কালার টিশার্ট, এক ডিজাইনের বঙ্গবন্ধুর ছবি কারা সাপ্লাই দিয়েছিলো? এই আন্দোলনের নেতৃত্বে হঠাৎ করেই ভেসে উঠা অপরিচিত মুখ গুলো কারা, কি বা তাদের উদ্দেশ্য?

এবার সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির প্রয়োগের বিষয়ে আলোচনায় আসা যাক :

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা: ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা: ১০ শতাংশ, নারী কোটা: ১০ শতাংশ, উপজাতি কোটা: ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী কোটা: ১ শতাংশ চলমান আছে

মেধার ভিত্তিতে ৩৩তম বিসিএসে ৭৭.৪০ শতাংশ, ৩৫তম বিসিএসে ৬৭.৬৯ শতাংশ এবং ৩৬তম বিসিএসে ৭০.৩৮ শতাংশ ক্যাডার সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছে। অর্থাৎ কোটায় যোগ্য মেধাবীদের না পাওয়া গেলে বাকিদের থেকে তা পূরণ করা হয়।

পিএসসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ড. সাদত হোসাইন কোটা পদ্ধতি প্রয়োগের প্রক্রিয়াটি ব্যখ্যা করে বলেন, কোটা প্রয়োগ করা হয় সবরকম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মেধা তালিকার ভিত্তিতে। পরীক্ষায় কোনো কোটা সিস্টেম নেই। প্রার্থীরা প্রিলিমিনারী, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী মেধা তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সুতরাং যাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয় তারা সবাই মেধাবী। মেধাহীন কাউকে চাকরি দেয়া হয় না।

দেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ২ লাখের মত, এখানে কোটা ৩০%। প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২০ লাখ ১৬ হাজার, এখানে কোটা ১%। দেশে উপজাতি ১৫ লাখ ৮৬ হাজার, কোটা ৫%। দেশে নারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৮ কোটি ৫০ লাখ, কোটা ১০%। জেলা কোটা আছে ১০%। এই ৯ কোটি মানুষের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা। আর বাকি ৮ কোটি মানুষের জন্য আছে ৪৪ শতাংশ কোটা। এছাড়া জেলার বাসিন্দা হিসেবে সব মেধাবীরাই কোটার অাওতায় পড়ে। নারী হিসেবে প্রত্যেক মেধাবী নারী কোটার মধ্যে পড়ে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার। সরকারি চাকরিতে শুন্য পদ ৩ লাখ ৫৯ হাজার ২৬১ টি (১৬ জানুঃ সংসদে জনপ্রশাসন মন্ত্রীর দেয়া তথ্য মতে)। এতেই প্রমানিত হয় কোটা সংস্কার বা বাতিল করলেই দেশের বেকারত্ব দূর করা সম্ভব না। যেসব ছাত্র ছাত্রী কোটা নিয়ে আন্দোলন করেছে তারা নিজেরাও এব্যাপারে ভেবেছে কিনা তা আমার বোধগম্য নয়।

পরিশেষে বলতে চাই, ছাত্র সমাজের শুভ বুদ্ধির উদয় না হলে একসময় এই কোটা আন্দোলনই পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রুপান্তরিত হবে। কিন্তু রাজাকারদের উত্তরসূরীদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে দেয়া যাবেনা। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেড়ে উঠতে হবে, স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-শিবির-রাজাকারদের ঘৃণা করতে হবে। সরকারের উচিৎ অবিলম্বে রাজাকারের তালিকা করে উত্তরসূরীদের অধীকার সংকুচিত আইন করতে হবে। এদের সব ধরনের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের সকল সম্পদ সরকার বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত সকল মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত হওয়া রাষ্ট্রীয় সকল সুবিধা ফিরিয়ে দিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে মুক্তিযোদ্ধাদের, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। জয় বাংলা বলে এগিয়ে যাবে আগামী প্রজন্ম।

 

এম. ইউ. আহমদ নিঝুম
নির্বাহী সম্পাদক
মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠ ডটকম
muktijoddharkantho.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া