কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক ক্যান্সার রোগী, কাজের মেয়ে যা করলেন!

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
জুলাই ১০, ২০১৮ ১০:০১ অপরাহ্ণ

এম নজরুল ইসলাম, বগুড়া অফিস ।। কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক ষাটার্ধ বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। সম্পত্তির লোভে বাড়ির কাজের মেয়ে রুবিয়াকে স্ত্রী বানিয়ে ভূয়া নিকাহনামা তৈরী করা হয়। বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার শয্যাশায়ী। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বাক্ষর ও টিপসহি জাল করে দুই কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে একটি সক্রিয় সংঘবদ্ধ চক্র। কাজের মেয়ের নামে জমির দলিল রেজিস্ট্রি করে নেয়। অবশেষে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে ভেস্তে গেছে সব পরিকল্পনা। সম্পত্তির জালিয়াতি দলিল রেজিস্ট্রি বন্ধ করলেন উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) কর্মকর্তা।

বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের বাগড়া এলাকার মৃত এলাহী বক্সের বড় ছেলে স্ত্রী-সন্তানবিহীন আব্দুস সাত্তার দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী। তারই অনুুকুলে শেরপুর পৌর মৌজার জেএলনং ১০৯, খতিয়ান ৬৩০, দাগ নং ২২৪০/৩৮০৫ এ শহরের স্যানালপাড়ায় ১৪ শতাংশ প্রায় ২ কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে সক্রিয় কাজকর্মে জড়িত হয় জালিয়াতি চক্রটি। ওই কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত করতে ক্যান্সার রোগীর সেবাসুুশ্রুতাকারী কাজের মেয়ে রুবিয়া খাতুন রুবিকে ভূয়া কাবিননামায় স্ত্রী বানিয়ে দেয় আদ্যক্ষর (ওয়াই) নামের নেপথ্যের চক্রের সক্রিয় সদস্যরা। সম্পত্তি দলিল রেজিস্ট্রি কাগজপত্র পূর্বে থেকেই তৈরী করে রেখে এবং গত ১১ জুন প্রকৃত জমির মালিক সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে অনুপস্থিতি ও স্বাক্ষর টিপসহি জাল করার মাধ্যমে কাজের মেয়ের নামে জমি রেজিস্ট্রি দলিল করে নেয় ওই সংঘবদ্ধ চক্র। অবশ্য দলিল রেজিস্ট্রির সময় সাব-রেজিস্টার দাতা ক্যান্সার রোগী আব্দুস সাত্তারের উপস্থিতির কথা প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করলেও তিনি ওই হাসপাতাল বেডে শয্যাশায়ী ছিলেন বলে দাবি করেছেন তার সহদর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম।

১১ জুন ক্যান্সার রোগীর ওই সম্পত্তির জালিয়াতি দলিল করে নিয়েই তড়িঘড়ি করে সুকৌশলে রুবিয়ার ছবি সংগ্রহ ও নাম স্বাক্ষর জাল করে তার অনুস্থিতিতেই গত ১২ জুন শেরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) কার্যালয়ে ৩৫৫০(৯-১)/১৭-১৮ নং নামজারি খারিজের আবেদন করে প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ চক্র। নামজারির স্থানীয় সময়সীমা অনুযায়ী ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার ঘোষনা থাকলেও উপজেলা ভুমি অফিসের কতিপয় কর্মচারীদের যোগসাজসে সম্প্রতি ঈদের ছুটির শেষে মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই খারিজ কাজ সম্পন্ন করে। রুবিয়াকে ছাড়াই অন্য লোককে কাগজপত্র দিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট অফিস। এদিকে দাতাবিহীন জমি রেজিস্ট্রি ও আবার খারিজি নামজারির প্রচেষ্টার খবর জানতে পেয়ে কাজের মেয়ে রুবিয়া গত ১ জুলাই তার নাম স্বাক্ষর জাল ও সুকৌশলে ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে মর্মে নিজ উপস্থিতিতে ওই নামজারি বাতিলের একটি লিখিত অভিযোগ দেয়।

এতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুম) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মো. লিটন সরকার আবেদনকারী রুবিয়া লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দিতে গত ২ /৭/১৮ইং তারিখের নামজারির আদেশ ও তৎমুলে সৃষ্ট ১০৯নং শেরপুর মৌজার ৮৯৩৯ নং হোল্ডিং বাতিল করে তফসীলি সম্পত্তি পূর্বের হোল্ডিং এ ফেরত প্রদানের আদেশ দেন। এতে ক্যান্সার রোগী আব্দুস সাত্তারের কোটি কোটি সম্পত্তি জালিয়াতি সংঘবদ্ধ চক্রের হাত থেকে পুনরায় দলিল রেজিস্ট্রির হাত থেকে আপাতত রক্ষা পায়।

এদিকে, আব্দুস সালাম ও ছাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের বড়ভাই আব্দুস সাত্তার স্ত্রী-সন্তানবিহীন এবং ষাটোর্ধ বৃদ্ধ লিভার ক্যান্সারের রোগী। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসা শাস্ত্রতে তার আরোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন। শুধু কেমোথেরাপীর উপর অনেকটা বেচে থাকা। সেই মৃত্যুপথযাত্রীর নামে পৌর শহরের কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত ও জালিয়াতি দলিল করতে আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে রুবিয়াকে গত ২/৩ মাস আগে ভূয়া নিকাহনামা তৈরী করে ক্যান্সার রোগীর স্ত্রী বানিয়ে দেয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সেই মোতাবেক সক্রিয় সংঘবদ্ধ চক্ররা ক্যান্সার রোগীর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকলে তার অনুস্থিতিতেই জাল স্বাক্ষর ও টিপসহি দিয়ে কোটি টাকার সম্পত্তি রুবিয়ার নামে দলিল রেজিস্ট্রি করে নেয় এবং পরবর্তীতে তাদের পছন্দমত ব্যাক্তির নামে পুনরায় দলিল করে নেয়ার ফন্দি আটে। সম্পত্তির মালিক ষাটার্ধ বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, মালিকের অনুপস্থিতি ও স্বাক্ষর টিপসহি জাল করে জমির দলিল করে দিয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার।

এপ্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেরপুরের সাব-রেজিষ্ট্রার নুরুল হাকিম বলেন, সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস কার্যালয়ে ওইদিন দাতা উপস্থিত ছিলেন এবং স্বাক্ষর দিয়েছেন।

বর্তমানে কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা দাবীকারি রুবিয়া বলেন, আমি ক্যান্সাররোগী সাত্তারের বাড়ির কাজের মেয়ে ছিলাম, তার সেবার জন্য বিয়ে করি। কিন্তু জমি দলিল রেজিস্ট্রি ও পরবর্তীতে খাজনা খারিজের আবেদন বিষয়ে কিছুই জানতাম না। জানতে পেয়ে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে বাতিল করেছি। তাছাড়া এ সম্পত্তি বেহাত করতে একটি চক্রও আমাকে নিয়ে খেলছে। বুঝতে পারছিনা।

উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) লিটন সরকার বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় রুবিয়ার উপস্থিতি জবানবন্দি ও লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতেই নামজারিকৃত হোল্ডিং বাতিলের আদেশ প্রদান পূর্বক ওই আদেশ কপি সাব-রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া