প্রধানমন্ত্রীর নিকট ঢাবি শিক্ষকের খোলা চিঠি

ডেস্ক রিপোর্ট , মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ
জুলাই ১১, ২০১৮ ১:০৮ অপরাহ্ণ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
বিষয়: সরকারি চাকুরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অপরিবর্তীত রাখার জন্য আবেদন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সরকারি চাকুরীতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের উত্তরাধিকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত ৩০% সম্মানী কোটা কোনোক্রমেই বাতিল করা যাবে না। আপনার মত একজন প্রাজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই।
শুধু একটা ঘটনার কথা বলি। বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার পর কিউবা সফর করেন, তখন সে দেশের মহান নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন- ‘মুজিব! তুমি তোমার মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েই তোমার প্রশাসন যন্ত্র গড়ে তোলো।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর উপদেশ না নিয়ে পাকিস্তান প্রত্যাগত আমলা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি, তাদেরকে দিয়েই প্রশাসন ও সেনাবাহিনী সাজিয়ে ছিলেন। এ ভুলের খেসারত আমাদের মহান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তথা আপনার পরিবারের সকল সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে দিতে হয়েছে। মনে রাখবেন, বিগত ১০ বছরে আপনাকে হত্যা করার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যত ষড়যন্ত্র হয়েছে, তার সবগুলোই মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানেরাই বারেবারে প্রতিহত করেছে। কারণ, তারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়েছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০% চাকুরী কোটা শুধু নয়, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা যখনই যেখানে চাকুরীর জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জন করবে তখনই তাদেরকে সেই চাকুরীতে নিয়োগ দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আপনাকে আরও একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পরে দীর্ঘ ২৯ বছর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোন চাকুরী হয়নি। উপরন্তু, রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার ও জওয়ানদের হত্যা করা হয়েছে। বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ঐ প্রায় তিন দশক সময়কালে প্রশাসনযন্ত্রে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অংশগ্রহণ শূন্যের কোটায় পৌঁছেছিল। তার ফলে, স্বাধীনতা বিরোধীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র ঝেকে বসেছে। এই অবস্থা উত্তরণের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও প্রশাসনযন্ত্রের সর্বত্র স্বাধীনতার স্বপ্নস্বাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সংরক্ষিত ৩০% কোটা অব্যাহত রাখুন এবং কোন বিচারেই এই কোটা সংকুচিত করা যৌক্তিক বিবেচিত হবে না।
সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, নারীর নিরাপত্তা বিধান তথা নারীর ক্ষমতায়নের জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রের সর্বক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরী হয়ে পড়েছে। আপনি যদি ১০% নারী কোটা বাতিল করেন, তাহলে জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ অনিবার্যভাবেই পিছিয়ে পড়বে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সরকারী চাকুরীতে জেলা কোটা প্রবর্তনের ফলে বিগত এক দশকে বাংলাদেশের সকল জেলায় মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়েছে। আজ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া রুপসা থেকে পাথুরিয়া সর্বত্র অনেক পরিবারেই আমলা, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সহ প্রথম শ্রেণির সরকারী চাকুরীজীবী খুঁজে পাওয়া যায় -যা এক দশক আগেও এতটা চোখে পড়েনি। মানবসম্পদের এই সুষম বন্টণ অব্যাহত রাখতে না পারলে আমরা আমাদের মানচিত্রের সকল অংশের জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের সুষম কাঠামোর আওতায় আনতে পারবো না। সুতরাং, ১০% জেলা কোটা বাতিল করা উচিত হবে না।
প্রতিবন্ধীরা হচ্ছে আমাদের মানবিকতার প্রতিচ্ছবি, সেই কোটা বাতিল করলে তো মানুষের বিবেকবোধ ও মানবতাই ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই কোটা তো আমরা বাতিল করতে পারবো না। আমাদের নৃগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আমাদেরই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যে দেহ, তার একেকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ। আমরা তাদেরকে ব্যবচ্ছেদ করতে পারি না। সুতরাং, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এ কোটা বাতিল করা রাষ্ট্রের বিবেকবোধকেই নাড়িয়ে দেবে।
তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন বিচার বিশ্লেষণে আপনি এই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করবেন, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। কোটা ব্যবস্থা বাতিল হলে আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে চাকুরীক্ষেত্রে এক নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হবে। উদাহরণস্বরূপ- যিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রী হবেন, যিনি বা যারা পিএসসির চেয়ারম্যান বা সদস্য হবেন, তাদের আত্মীয়স্বজন ও তাদের এলাকার (জেলা, থানা) লোকজন চাকুরীক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে। আবার তারা যদি অসাধু কর্মকর্তা হন, তাহলে তো মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্য থাকবেই। সুতরাং, চাকুরীক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়নের এক সুষম ব্যবস্থা যা শুধু আমাদের দেশ নয়- পৃথিবীর অনেক দেশই তা অনুসরণ করে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন, তা গভীরভাবে আমি পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু এখানে অতি ধনী এবং অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিপরীতক্রমে সমানুপাতিক হারে বেড়েছে। ব্যাপক সংখ্যক অতি দরিদ্র নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং তাদের পরিবারের সন্তানেরা চাকুরী ক্ষেত্রে বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। রাষ্ট্র যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসততা, ঘুষ ও দুর্নীতি চর্চার কারণে অতি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানেরা সরকারী চাকুরী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে এই অতি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরাই ছিলো প্রথম ও মূল শক্তি। কিন্তু রাষ্ট্র ও স্বাধীনতাবিরোধী অশুভ শক্তি জামাত-শিবির এক পর্যায়ে এখানে যুক্ত হয়ে আন্দোলনকে ধ্বংসাত্মক ও অরাজক পথে ধাবিত করে। যার ফলে একটি সাময়িক অস্থিরতা দেখা দেয়। তবে কেউই কিন্তু কোটা বাতিল চায়নি। আমার পর্যবেক্ষণ হলো- এই যে আয়হীন, নিম্ন আয়ের পরিবারের উচ্চশিক্ষিত সন্তান যারা চাকুরী পাওয়ার ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য আরও ১০% সরকারী চাকুরী কোটা সংরক্ষণ করা যায় কিনা তা বিবেচনা করার জন্য আপনার প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি- বর্তমানে যে ৫৬% কোটা আছে, তার সাথে আরও আয়হীন ও নিম্ন আয়ের পরিবারের (যেমন- ছোট চাকুরে, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা সহ এই ধরণের জনগোষ্ঠী) জন্য আরও ১০% কোটা যুক্ত করা হোক। এমনকি জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির যে চাকুরীগুলো আছে, তার ৫০% পর্যন্ত আয়হীন ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এভাবে আমরা কোটা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের যে বৈষম্য, তা দ্রুত কমিয়ে আনতে পারি এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ-সুষম ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হতে পারি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে যারা আমাদের জাতির গর্বের প্রতিষ্ঠান জ্ঞানের আলোকবর্তিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অসম্মান করেছে, মাননীয় উপাচার্যের বাসভবন সীমাহীন অবমাননার মত অপরাধ করেছে, তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিবিধান করতে হবে; যাতে ভবিষ্যতে কেউ কখনো অ্যার এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার সাহস না দেখায়।
মহান আল্লাহ্‌ তায়ালা আপনাকে সুস্বাস্থ্য দান ও দীর্ঘজীবী করুন। আমিন।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

 

অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও
সিনেট সদস্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া