ঢাবিতে ক্লাস পরীক্ষা বর্জনে কলকাঠি নাড়ছেন পাঁচ শিক্ষক

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
জুলাই ১৩, ২০১৮ ৩:৩৭ অপরাহ্ণ
ঢাবি প্রতিনিধি ।। গত কয়েক মাস যাবৎ সরকারী চাকরীতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে একদল শিক্ষার্থী। তাদের আন্দোলন আস্তে আস্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে এরই মধ্যে মহান সংসদে কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সাথে তিনি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য  বিশেষ ব্যবস্থা রাখা রাখার ঘোষণা দেন। এরপর কোটা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আন্দোলন থেকে সরে আসে। যদিও অভিযোগ আছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ও তাদের অর্থায়নে এই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলে আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন রোজা ও পবিত্র ইদ উল ফিতরের ছুটির পর চালু হলে প্রজ্ঞাপনের দাবীতে ফের আন্দোলনে নামে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একটি অংশ।
প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে  কটুক্তি করেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদ খাঁন। সেখানে রাশেদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দ্যেশ করে বলেন ‘এটাকি তার বাপের দেশ? যে যা ইচ্ছে তা করবে।’ এই বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রজ্ঞাপনের দাবীতে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন করতে এসে একদল শিক্ষার্থীর হামলার শিকার  হয় নূরুল হক নুরু। হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস, পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারী। এর পর দিন শহীদ মিনারে কর্মসূচি পালন করতে এসে ফের হামলার শিকার হয় ফারুক সহ বেশ কয়েকজন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী এবং কয়েজনকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ।
ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষনার ফলে প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট ক্লাস বর্জন করলেও অধিকাংশ ডিপার্টমেন্ট তা প্রত্যাখান করে ক্লাস পরীক্ষায় অংশ নেয়। ক্লাস না হওয়া ডিপার্টমেন্ট গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, আইন অনুষদ ও মার্কেটিং বিভাগ। এই তিনটি ডিপার্টমেন্টে ক্লাস না হওয়ার বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। খোদ নিজ নিজ বিভাগের কিছু শিক্ষকই এর সাথে জড়িত থেকে ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণাকে সমর্থন দিতে দেখা গেছে।

এই সকল শিক্ষকরা হলেন ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফেরদৌস আমান, সহযোগী অধ্যাপক মাহবুব কায়সার, সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সহকারী অধ্যাপক দেবাশীষ কুন্ডু কাকন, অাইন বিভাগের শিক্ষক আসিফ নজরুল।
এই সকল শিক্ষক শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে উস্কে দেয়ার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা যখন প্রধামন্ত্রীর উপর আস্থা রেখে আন্দোলন থেকে সরে এসেছে তখন সরকার বিরোধী অপর একটি অংশ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনড়। এই অংশটি গভীর রাতে ছাত্রীদের হলে স্লোগান ও মিছিল মিটিং করতে দেখা গেলেও ছাত্রদের হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থানের কারণে অান্দোলন করতে ব্যার্থ। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার বিরোধী শিক্ষকদের একটি অংশের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন ছাত্র ছাত্রীদের ক্লাস পরীক্ষা বর্জন চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করছেন। পাশাপাশি নিজেরাও বিভিন্ন ব্যানারে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করছে। এর মধ্যে ঢাবির শিক্ষক আসিফ নজরুল নিজেই বিভিন্ন টকশোতে গিয়ে আন্দোলনের পক্ষে সাফাই গাইছেন পাশাপাশি নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের দিয়ে মানববন্ধন করাচ্ছেন।
এ বিষয়  আইন বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. নাইমা হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন “আইন বিভাগে পরীক্ষা গুলো নিয়মিত হচ্ছে তবে ক্লাসে শিক্ষার্থী না আসায় ক্লাস গুলো নিয়মিত করা সম্ভব  হচ্ছে না।আইন বিভাগের কোন শিক্ষকের ইন্ধনে ক্লাস বর্জন হচ্ছে এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন ইন্ধনের  বিষয়টি কারো ব্যাক্তিগত ব্যাপার, এই বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না।”
অন্যদিকে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা মশিউরের মুক্তির দাবীতে আন্দোলন করে আসছে তার ডিপার্টমেন্টের গুটিকয়েক শিক্ষার্থী। এই বিভাগের অন্তত চার জন শিক্ষক ক্লাস বর্জনের সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছে বলে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে অধ্যাপক ফেরদৌস আমান ও সামিনা লুৎফার নাম বেশ কয়েটি জাতীয় পত্রিকায় এসেছে। তারা সরাসরি কোটা সংস্কার আন্দোলনে রশদ জোগাচ্ছেন। পাশাপাশি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার একই বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন তার নির্ধারিত রুটিন অনুযারী  ক্লাস নিতে গেলে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখোমুখী হন। এই সময় ড. সামিনা লুৎফা আন্দোলনকে যৌক্তিক দাবী করে আ ক ম জামাল উদ্দিনকে সরে যেতে বলেন। এক পর্যায়ে নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলে বিভাগের চেয়ারম্যান ড.নেহাল করিম এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন প্রফেসর সাদেকা হালিমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন “বৃহস্পতিবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সকল ডিপার্টমেন্টে ক্লাস হয়েছে। তবে কয়েকটি ডিপার্টমেন্টে উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলে ও আগামী ক্লাসে গুলোতে সবাই থাকবেন বলে আশা করছি।” সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি নিজেও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। বৃহস্পতিবার আমার অনুষদের চেয়ারম্যানদের নিয়ে আমি এক ঘন্টার মিটিংয়ে বসেছি। সেখানে ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি।
ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের বিষয়ে বিজনেস ফ্যাকাল্টির  শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে ডীন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের তেমন কোন তৎপরতা দেখা যায় নি।
মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নয় এমন এক শিক্ষার্থী বলেন “আমরা অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস করতে চাইলেও ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন শিক্ষার্থীর জন্য ক্লাস করতে পারছিনা। অথচ এভাবে ক্লাস না হলে আমাদের সেশনজটে পড়তে হবে। এই বিষয়ে চেয়ারম্যান স্যার, ডীন কারো তেমন কোন মাথা ব্যাথা নেই।”
বিজনেস ফ্যাকাল্টির ডীন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শিবলী রুবাইয়াতের  সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘটনায় শিক্ষকদের ইন্ধন থাকার বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিচারের দাবী জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া