মুক্তাব্দ : একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা ও প্রাসঙ্গিক কথা

মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ ,
সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮ ১১:২৮ অপরাহ্ণ

আমরা ধরে নিই সময়ের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অংশ হলো ‘সেকেন্ড’। ৬০ সেকেন্ডে মিনিট, ৬০ মিনিটে ঘন্টা, ২৪ ঘন্টায় দিন, ৩৬৫ দিনে বছর। মানুষ স্মৃতি মন্থন করতে ভালবাসে এবং সেজন্যই বুঝি এসব হিসাব। মহাকাল চলছে- শুরু আছে- শেষ আছে- হয়তোবা আছে- হয়তোবা নেই- তার মধ্যে কিছু চিহ্ন, হিসাব নিকেশ।

প্রাচীন আরবে কাঁচা ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত মাটির পাত্রে পানি ভরে ২৪ ঘন্টার হিসাবটিকে মানুষ আয়ত্তে আনতে থাকে। বলা হয়ে থাকে অতি প্রাচীনকালেও সময়ের হিসাবের জন্য বর্ষপঞ্জির অভ্যাস প্রচলিত হয়ে থাকে। ‘মায়া’ পঞ্জিতে এমনকি পৃথিবীর মহাপ্রলয়ের কথাও বলে ফেলা হয়। গত ১৩৪৫-এর ৭ মহরম শুক্রবার সে হিসাবে মহাপ্রলয়ের তারিখটি পড়ে ছিল। ভাগ্যিস পৃথিবী ধ্বংস হয়নি। মুসলমান সমাজে বলাবলি আছে, মহরম মাসের ১০ তারিখ কেয়ামত হবে আর বারটি থাকবে শুক্রবার।

উল্লেখ করা যায়, আমরা প্রতিদিন দিন গণনা করি- বার, বছর গণনা করি। নাম ছাড়া তা’ চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। নাম ফারসি শব্দ যার অর্থ চিহ্ন। বলা হয় অষ্টপ্রহর। সংগীতজ্ঞরা সুরের খেলায় প্রহরের নির্দেশনা পেয়ে থাকেন সপ্তাহে ৭টি দিন, এদেরও নাম আছে। বাংলায় শনি, রবি ইত্যাদি, ইংরেজিতে স্যাটারগে, সানডে, ফারসিতে শনিচার, এতোয়ার, আরবিতে এয়মুস্-সাবতে, এয়মুল আহাদ। মাস আছে ১২টি। বাংলায় বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ- ইংরেজিতে জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী- আরবিতে মহরম, সফর। শত কোটি মানুষের শত কোটি নাম। কারও বা এক নামে পোষায় না। পৃথিবী নামের খেলা-নাম ছাড়া কে কাকে চেনে! যে প্রশ্নের অবতারণা করতে চাই সে টা হলো বর্ষপঞ্জি- ‘ক্যালেন্ডার’। Book of Genesis-Anno mundi পৃথিবীর বয়স- সংগীত পূজারিদের Big Band Era ঈশ্বর কণা ইত্যাকার নিকাশ বিকাশ-ইহুদিদের হিব্রু পঞ্জিকার হিসাব- বৌদ্ধের মহাপ্রয়াণ ধরে বৌদ্ধ পঞ্জিকা- রুমান হিরুদের নগরজয় ও পত্তনের গণনার হিসাব-চীনাদের চৈনিক পঞ্জিকার হিসাবের নামটি কার বা অজানা। শোনা যায় বাদশাহ আকবর তার খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে পরবর্তীতে ১লা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ হিসেবে গণনার প্রচলন করে, যার ভত্তি ছিল হিরজি সন। বাংলা ১২ মাসের নাম কে কিভাবে কখন নির্ধরণ করে আমার জানা নেই- অর্থহীন কোন কিছুই বিবেকী মানুষের ওপর বিস্তার লাভ করবে পারে না। হয়তোবা এদের অর্থ আছে। ইংরেজী মাসের নামগুলো বিভিন্ন শুভ অশুভ দেব-দেবীর নামে।

সর্বোপরি বলার অপেক্ষা রাখে না যে এসব নাম চিহ্নয়নের পশ্চাতে কোন না কোন ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, আঞ্জলিক প্রভাব ক্রিয়াধীন হয়েছে। ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, ঐতিহাসিক তথা অর্থনৈতিক বিশেষ কারণ ইত্যাকার বিষয়াদিকে স্মরণীয় করতেই বুঝি সময়ের হিসাব। এবস নামকরণ।

পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিষয় চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলা যায়, কোন নির্দিষ্ট দেশ বা জাতি তাদের কোন গৌরবোজ্জ্বল অসাম্প্রদায়িক জাতীয় ঘটনাকে স্মরণীয় ও বরণীয় তথা অমর করে রাখতে কোন বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেনি। আমরা বাঙালি জাতি। আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক ঘটনাই তাবৎ পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো ঘটে থাকে। ’৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি- লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে হাজার বছরের শত গ্লানি কাটিয়ে একটি নতুন পতাকা পেয়েছি। পৃথিবীর অন্যতম সুশিক্ষিত নিয়মিত সেনাবাহিনীকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করিয়েছি। এ স্বাধীনতা গোলটেবিলের আলোচনার স্বাধীনতা নয়।

প্রতিটি বাঙালির শরীরে সে দিন স্বাধীনতার শানিত স্পন্দন, যা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম করেছে। ‘এবারের সংগ্রাম.. .. .. মুক্তির সংগ্রাম’ শুধু বাঙালির নয়, সারা বিশ্বকে অনুরণিত করেছে। জাতির এ মহান যাত্রার শুভ লগ্নটিকে আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গণনায় ক্রিয়াশীল করে রাখতে পারি না? ১৬ ডিসেম্বরকে আমরা বিজয় দিবস হিসেবে পালন করি। বাংলাদেশ সেদিন মুক্তিযুদ্ধের মাধমে মুক্ত হয়, স্বাধীন হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তির বয়সের ঐতিহাসিক শুভযাত্রা ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। আর সেই ‘৭১ই হতে পারে ১ম গণনা মুক্তাব্দ’-এর। এতে করে আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় কোনো গণনাতেই কোন বিরূপ প্রভাব পড়ার কিছু নেই। বর্ষ গণনায় বঙ্গাব্দ, খ্রিষ্টাব্দ, হিজরী সন ইত্যাকার মত শুধু যুক্ত হবে ‘মুক্তাব্দ’ সনটি। যেমন- বর্তমানে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দটিতে আমাদের শুত্রমুক্ত হওয়ার বয়স হবে ৪৭ বছর- অর্থাৎ ইংরেজী মাসের তারিখের পর লেখা হবে ‘মুক্তাব্দ’। যেমন- ১৬ ডিসেম্বর, ৪৭ মুক্তাব্দ; ১১ ভাদ্র, ৪৭ মুক্তাব্দ; ১লা মহরম, ৪৭ মুক্তাব্দ.. ..। বাংলার স্বাধীন নবাবের পতন পলাশী যুদ্ধ ১৭৫৭ খ্রি: অর্থাৎ ২১৮ মুক্ত পূর্বাব্দ, সিপাহী বিদ্রোহ ১১৮ মুক্ত পূর্বব্দ, তিতুমীরের আত্মদান.. .. মুক্ত পূর্বাব্দ, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ২৩ মুক্ত পূর্বাব্দ ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ‘মুক্তি’ শব্দটিই প্রাধান্য পেয়েছে। সেই থেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ‘মুক্তিবাহিনী’। বাঙালির ‘মুক্তিযোদ্ধ’। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তির দিবস-  ‘মুক্তি দিবস’। বিজয়ের সঙ্গে আধুনিক ধারণায় শুধু ভৌগোলিক, রাজনৈতিক নয়- অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বৈশ্বিক অবস্থান, প্রতিযোগিতা ইত্যাকার বিষয়াদিও জড়িয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সার্বিক সেই স্বপ্ন বাঙালি হৃদয়ে যুগ যুগ প্রতিপালনে বাস্তবায়নের একটি চলমান ব্রত। আমাদের গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ ‘৭১-এর যুদ্ধের বছরটাকে সংগ্রামের বছর হিসেবেও বলে থাকে- যা বঙ্গবন্ধুর সেই- ‘এবারের সংগ্রাম’- এরই প্রতিধ্বনি সাধারণ মানুষের মনে ও কণ্ঠে। গ্রামের অনেকেই বয়স আন্দাজ করতে গিয়ে সংগ্রামের বছরে-যুদ্ধের বছরে কত বয়স-এভাবে গণনা করে মিলাতে চেষ্ট করে। তাই একথা স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রমাণ হয়ে আছে, বাঙালির হিসাবের যে মনদন্ড কার মনন ও চলনে প্রোথিত আছে- সেটা তার মুক্তিযুদ্ধ।

আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্ত দিবসের ঐতিহাসিক সময় গণনায় নিয়ে এলে প্রতিনিয়ত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে আমরা কবে স্বাধীন হয়েছি, আমাদের বয়স কত? এতদিনে কতটুকু অর্জন করলাম, আগামী বছর বা ভবিষ্যতে কতটুকু অর্জন করা উচিত। এসব জাত্যভিমানী ধ্যান ধারণায় বাঙালি প্রতিনিয়ত স্বকীয় জাতীয়তায় স্নাত হবে- হবে উজ্জীবিত, এটাই হোক বাঙালির এমন ইতিহাস সৃষ্টিকারী যাত্রার অঙ্গিকার।

 

মুহম্মদ মাহবুব-উল ইসলাম
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, কিশোরগঞ্জ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া