দেশের খবর - October 7, 2018

ময়মনসিংহে প্রেমিকের মাধ্যমে ভারতে পাচার হওয়া যুবতী ৮ মাস পর উদ্ধার, প্রতারক প্রেমিকসহ আটক ২

ভারতে পাচার করার আট মাস পর মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায় কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশের অভিযানে পাচার হওয়া যুবতি দেশে ফিরে এসেছে। ঐ যুবতী আদালতে পাচারকারীদের নাম ঠিকানা প্রকাশ করেছে। পুলিশ নারী পাচারকারী চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো, শম্ভুগঞ্জের মাফি ও আকুয়া মড়লবাড়ির রুমা। পাচার হওয়া ঈশ্বরগঞ্জের ঝাটিয়া এলাকার যুবতি বাংলাদেশে তার মা ও একমাত্র কন্যা সন্তান মাইশা আক্তারের (৯ মাস বয়সী) কাছে ফিরে আসতে পেরে মানবাধিকার সংগঠন ও বাংলাদেশ পুলিশের (ময়মনসিংহের কোতোয়ালী পুলিশ) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

কোতোয়ালী পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ঝাটিয়া গ্রামের এক যুবতির সাথে মোবাইলের মাধ্যমে ময়মনসিংহ উপ-শহর শম্ভুগঞ্জের আব্দুল বারেকের ছেলে মাফি (২৮) এর সাথে প্রেমের সম্পর্ক ঘটে। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশী সময় তাদের মাঝে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক চলতে থাকায় প্রেমিক মাফি তার প্রথম স্ত্রী সন্তানের কথা গোপন রেখে ২০১৬ সালে মাফি তার প্রেমিকাকে মোবাইলে ডেকে নিয়ে আসেন ময়মনসিংহ শহরে। এক পর্যায়ে মাফি তার প্রেমিককে কোন ধরণের ধর্মীয় রীতিনীতি, আনুষ্ঠানিকতা ও রাষ্ট্রীয় স্বিকৃতি ছাড়াই বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে শহরের জামতলা এলাকায় বাসাভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে-। এভাবে মাফি ও তার প্রেমিকের মাঝে ঘর-সংসার ও বসবাস চলতে থাকায় প্রেমিকা গর্ভবতি হয়ে পড়ে। প্রথম স্ত্রী সন্তান গোপন রেখে অবৈধভাবে মাফি তার প্রেমিকাকে নিয়ে সংসার করাকালীন সময়ে প্রেমিকা গর্ভবতি হয়ে পড়ায় মাফি হতাশায় পড়ে। এরই মাঝে ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাসে তাদের কুলঝুড়ে আসে এক কন্যা সন্তান। নাম রাখেন মাইশা আক্তার। প্রেমিক মাফি বাসা পরিবর্তন করে। শহরের আকুয়া মড়লবাড়ি এলাকার জনৈক রুমার বাসায় ভাড়া উঠেন। এ বাসায় আসার পর ঘটে বড় বিপত্তি। সদ্য মা হওয়া প্রেমিকা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মাত্র পনের দিনের শিশু কন্যা সন্তান মাইশা আক্তারকে রেখে ভারতে পাচার হয়ে যায়।

পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, প্রেমিক মাফি প্রথম স্ত্রী সন্তানকে গোপন রেখে অবৈধভাবে প্রেমিকার সাথে ঘর-সংসার এবং তাদের ঘরে সন্তান আসার খবরটি আড়াল করে মাফি নানা কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এ লক্ষ্যে নবজাতককে নিয়ে নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য আকুয়া মড়লবাড়ির রুমার বাসায় ভাড়া উঠে। এক পর্যায়ে নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য রুমার সহায়তায় প্রেমিক মাফি তার প্রেমিকাকে পনের দিনের শিশু কন্যা সন্তানকে রেখে ভারতে পাচার করে দেয়। পুলিশ আরো জানায়, রুমার ঘনিষ্ট ভারতের মুম্বাইয়ে পাচারকারী পিয়াংকার হাতে প্রেমিকাকে গত ২ ফেব্র“য়ারী ২০১৮ তারিখে তুলে দেয় মাত্র ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে। এদিকে ১৫ দিনের শিশু সন্তান রুমার আকুয়ার বাসায় একা থাকায় শিশুর কান্নার শব্দে স্থানীয়রা খবর নিতে যায়। পরে ঐ শিশুকে একা ঘরে থাকতে দেখে তারা আশপাশ কাউকে না পেয়ে মানবাধিকার সংগঠনকে খবরটি জানায়। বাংলাদেশ জাস্টিজ এন্ড কেয়ার নামক এনজিওটি আদালতের মাধ্যমে ঐ শিশু সন্তানকে তাদের হেফাজতে নেন এবং পাচার হওয়ার যুবতির খোজ খবর নেন। এদিকে পাচার হওয়া যুবতি ভারতের মুম্বাইয়ের একটি অভিজাত হোটেলে পাচারকারী চক্রের ভারতীয় সদস্য পিয়াংকার হয়ে কাজ করতে থাকে। এক পর্যায়ে বিনা অনুমতিতে ভারতীয় অবিজাত হোটেলে কাজ করার দায়ে পাচার হওয়া যুবতি পুলিশের হাতে আটক হয়। তার এক মাসের জেল হয়। মানবাধিকার সংগঠনটি এ খবর জানতে পেরে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে জানতে পারে আকুয়া মড়লবাড়ি থেকে পাচার হওয়া যুবতি ভারতের মুম্বাইয়ে পুলিশের হাতে আটক প্রেমিকা। মানবাধিকার সংস্থাটি প্রেমিকার বাড়িতে যান এবং তার মাকে দিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা দায়ের করতে সহয়োগীতা করেন। যার মামলা নং ৬৫ তাং ১৭/৭/২০১৮ইং। অপরদিকে ঐ শিশু সন্তানটিকে তার নানীর হেফাজতে প্রদান করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালী মডেল থানার এসআই আবুল কাশেম পুলিশ সুপারসহ কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি মাহমুদুল ইসলামের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনায় মামলাটি তদন্ত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে যুবতি পাচারের মূলহোতা প্রেমিক মাফি ও তার সহযোগী রুমাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে মানবাধিকার সংগঠনটি পাচার হওয়া যুবতি দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের মুম্বাইয়ে যোগাযোগ শুরু করে। শুরু হয় চিঠি চালাচালি। বাংলাদেশ বিষয়টি গুরুত্ব নিলে সকল আনুষ্ঠানিকতার পর অবশেষে গত ৩/১০/১৮ ইং তারিখে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বাংলাদেশ জাস্টিজ এন্ড কেয়ার নামক মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায় বাংলাদেশ সীমান্তের বেনাপুল এলাকায় পাচার হওয়া যুবতিকে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবুল কাশেমের কাছে পাচার হওয়া যুবতিকে হস্তান্তর করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবুল কাশেম জানান, পাচার হওয়া ঐ যুবতিকে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে তিনি পেয়ে পরদিন ৪/১০/১৮ তারিখে ময়মনসিংহ আসেন। ঐ যুবতি ময়মনসিংহের অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল আদালতের বিচারকের কাছে জবানবন্দি প্রদান করেছে। জবানবন্দিতে প্রেমিক মাফির সাথে ঘরসংসার, সন্তান ধারণ এবং মাত্র পনের দিনের শিশু কন্যা রেখে পাচার হওয়ার বিস্তারিত কাহিনী তুলে ধরেছেন। এছাড়াও ভারতে তার উপর ভারতীয় পাচারকারী সদস্য পিয়াংকার নির্যাতন, অভিজাত হোটেলে তার উপর নানা অত্যাচার, জেল হাজতবাসের কাহিনী তুলে ধরেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা আরো বলেন, পাচার হওয়া ঐ যুবতিকে উদ্ধার শেষে আদালতের মাধ্যমে তার মা রাশিদার হেফাজতে প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ আট মাসেরও বেশী সময় পর পাচার হওয়া যুবতি দেশে ফিরে তার মা ও সন্তানের কাছে যেতে পেরে তিনি পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।


আরও পড়ুন