শারদ ভাবনা : সম্প্রীতির শিক্ষা বিকশিত হোক

প্রতিনিধি , মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ
অক্টোবর ৯, ২০১৮ ৬:৪৮ অপরাহ্ণ

শারদীয় উৎসব এদেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ভাব-গাম্ভীর্য ও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। সনাতনধর্মালম্বীদের মতে, দুর্গা শব্দের অর্থ যিনি দুর্গতি নাশ বা সংকট থেকে পরিত্রাণ করেন। অন্যমতে, দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন বলে তাকে দুর্গতিনাশিনী বলা হয়। হিন্দু ধর্মালম্বীরা তাঁকে মহাশক্তির একটি আধার মনে করেন। তাঁর অন্যান্য নামসমূহ হলো, চণ্ডিকা, যোগমায়া, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহারিণী নারায়নী, মহামায়া, কাত্যায়নী ইত্যাদি। দেবী দুর্গার অনেকগুলি হাত। তাঁর অষ্টাদশভূজা, ষোড়শভূজা, দশভূজা, অষ্টভূজা ও চতুর্ভূজা মূর্তিও দেখা যায়। তবে দশভূজা রূপটিই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। তাঁর বাহন সিংহ। মহিষাসুরমর্দিনী-মূর্তিতে তাঁকে মহিষাসুর নামে এক অসুরকে বধরত অবস্থায় দেখা যায়।

ভক্তের ভক্তি, শ্রদ্ধা, আর প্রার্থনায় মনের আর্তি জানানোর এ উৎসব সনাতন ধর্মালম্বীদের নিজস্ব পার্বণ হলেও সেটি এখন আর শুধু সনাতন ধর্মালম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন সমগ্র বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি অংশ। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে সরকারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ এ আয়োজনে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে থাকে। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তৎপর থাকে যেকোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা দুর্বৃত্তদের হাত থেকে যেকোন ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডকে প্রতিহত করতে। অপ্রিয় হলেও প্রকৃত বাস্তবতা হলো, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এতসব আয়োজনকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু কিছু দুষ্কৃতিকারী বা দুর্বৃত্তরা প্রায় প্রতি বছরই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে দুর্গা পূজার আগে প্রতিমা ভাঙ্গার একটা রীতি গড়ে তুলেছে। যেটাকে কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। এবছরও ইতোমধ্যে দুর্বৃত্তদের এরূপ অপকর্মের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি নীলফামারীর ডোমারে দূর্গা পুজা উপলক্ষে লক্ষী প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশে পূজা উদযাপন পরিষদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সারা দেশে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি। ২০১৭ সালে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পূজা মণ্ডপে এ সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার ৭৭টি। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৩৯৫। তাদের ভাষ্য ছিল, পূজার মণ্ডপ বাড়লেও, সেই সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়েনি। হিন্দুধর্মালম্বীদের মাঝে আতঙ্ক কমেনি। যার ফলে বাংলাদেশে পূজারির সংখ্যা দিন-দিন কমে যাচ্ছে। ১৯৫১ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭৪ সালে কমে গিয়ে তা দাড়ায় ১৪ শতাংশে এবং ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ৪ শতাংশে। আর এ ক্রমহ্রাসমান ধারা রুখতে না পারলে সংবিধানের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি ধর্ম নিরপেক্ষতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকৃত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। জয় হবে সাম্প্রদায়িক শক্তির।

গতবছর বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গোৎসবকে আরও আড়ম্বরভাবে উদযাপনের জন্য বঙ্গভবন, গণভবন, নগরভবন ও জেলা পর্যায়ের সরকারি ভবনগুলোতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সেই সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে দাবি করা হয়েছিল, পূজায় তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি দেশের সব কারাগারে উন্নত খাবার পরিবেশন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট বাতিল করে হিন্দু ফাউন্ডেশন গঠন, উৎসব চলাকালে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলা পরীক্ষাসহ নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রাখা। পূজোর সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বে একজন অন্যতম সুবিবেচক ও মানবতার ধারক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, হিন্দুধর্মালম্বী নেতৃবৃন্দ যে দাবী জানিয়ে ছিলেন, তাঁরই হাত ধরে, তা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলার শান্তিকামী, অসম্প্রদায়িক, শুভবোধসম্পন্ন মানুষের পদচারণায় মুখরিত হবে এ বারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এ শ্লোগান মানুষে মানুষে ভাতৃত্ববোধ ও সম্প্রতির শিক্ষাকে আরো বিকশিত করবে। সংকীর্ণতার জাল ছিন্ন করে উন্মেষ ঘটবে মুক্তচিন্তার। সবশেষে ধর্মীয় সকল উৎসবই হোক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরো দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যম।  

 

সুমিত বণিক,
জনস্বাস্থ্যকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ঢাকা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া