সবার জন্যই প্রতিবন্ধক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

ডেস্ক রিপোর্ট , মুক্তিযোদ্ধার কন্ঠ
অক্টোবর ২৭, ২০১৮ ৯:৪১ অপরাহ্ণ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা শুধুমাত্র সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না। এই আইন দেশের সব নাগরিকদের জন্যই প্রতিবন্ধক। তাই আইনটির আপত্তিকর ধারাগুলো সংশোধন করা না হলে এর বিরুদ্ধে সব শ্রেণির নাগরিকদের রুখে দাঁড়াতে হবে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘মুক্ত গণমাধ্যম : প্রেক্ষিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা একথা বলেন। আইন, মানবাধিকার ও সংবিধান বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ) এর উদ্যোগে এই আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এই আইনের অপরাধের সংজ্ঞায় অস্পষ্টতা আছে, যার ইচ্ছামত ব্যাখ্যা ও অপ্রপ্রয়োগ করা সম্ভব। এই আইনে গুজব, ভাবমূর্তি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ- শব্দগুলো রাখা হয়েছে। এগুলো নিয়ে সংজ্ঞা আসেনি। এই আইনের দ্বারা কোন সংস্থাকে যদি অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়া হয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয় না তখন সেটি অবশ্যই কালো আইন। এই আইনের অধীনে পুলিশের ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ, গৃহে প্রবেশ, গ্রেফতারসহ বেশ কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পুলিশকে অবাধ দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধকতাও আইনটির বিধানে তুলে ধরা হয়েছে। তাই এ আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। এটি শুধু আইনজীবী, সাংবাদিকের সমস্যা নয়, এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সব নাগরিকের দায়িত্ব।

দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, আমাদের সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে সরকারের তৃতীয় একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল বৈঠকটি হওয়ার আগেই আইনটি পাস হয়ে গেল। এতে আমাদের উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে। এ আইনে আমরা মাত্র ৯টি ধারার বিষয়ে আপত্তি দিয়েছি। আমরা কিন্তু পুরো আইনকে প্রত্যাখ্যান করিনি। আইনটিকে আমরা ফেলেও দেইনি। আমরা শুধু বলেছি এই ধারাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। কোথায় পরিপন্থী তা আমরা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছি। এ আইনটি শুধুমাত্র গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ক্ষতিকারক নয়। এটা আরও ব্যাপক। আমরা সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। আস্থা রেখেই আমরা একটি সমাধানের পৌঁছাতে পারবো। আমরা রাস্তায় প্রতিবাদও করবো, সরকারের সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যাব। আমরা এ প্রতিবাদে সারাদেশের মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে চাই।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের মহাসচিব শাবান মাহমুদ বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে তথ্য, আইন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়। সেখানে আইনমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছিলেন আমাদের এই উদ্বেগের জায়গাগুলোয় সংশোধনী আনা হবে এবং আইনটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে সংশোধনী হবে কিন্তু সেক্ষেত্রে আইনমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন, তিনি কথা রাখেননি। এই একটি জায়গায় আমাদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আরও ঘণীভূত হয়েছে। আমরা কোনো অবস্থাতেই সংশোধনী ছাড়া আইনটি বাস্তবায়ন বা কার্যকর হোক তা সাংবাদিক সমাজ থেকে মেনে নিতে পারি না। এই আইনটি পাস করার মাধ্যমে সরকার নিজেদের স্বৈরাচারী সরকার বলে পরিচয় দেবে না বলে আমরা বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, সবাই যদি মনে করি আইনটি সবার স্বার্থে এবং জনগণের স্বার্থে হয়নি, তবে আইনটি অবশ্যই সংশোধন করা যাবে। আইনটি কোন বাইবেল নয় যে সংশোধন বা বাতিল করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী যদি প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন তবে অবশ্যই বাস্তবায়ন করবেন। আমি মনে করি ডিজিটাল বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও এ আইন করছে সরকার।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, সম্প্রতি ডিজিটাল সিকিউরিট আইন পাস হয়েছে। আমরা দেখেছি কোনো আইন করার আগে কোনো সুপারিশ থাকে। অথচ এই আইন করার আগে কোন আইন কমিশনের কোনো সুপারিশ ছিল কিনা তা কিন্তু আমাদের জানা নেই। বিশেষ ক্ষমতা আইনের থেকেই এটি ভয়ানক আইন। তাই শুধু সাংবাদিক নয় এই আইনের প্রয়োগের আগেই আমরা সবাই আইনটি নিয়ে কথা বলি। এই আইনের অবশ্যই সংশোধনী হওয়া দরকার। আওয়ামী লীগ বলছে আগামীতে নির্বাচনের আসলে এই আইনের সংশোধন করা হবে। তাহলে এখন করতে সমস্যা কোথায়। আমি মনে করি শুধু মাত্র বিরোধী জোটকে দমন করার জন্য এই আইন করা হয়েছে। দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করার জন্য এই আইন। এটা দেশের জন্য ক্ষতিকর। কারণ গণমাধ্যম দুর্নীতি নিয়ে এখন অনুসন্ধান রিপোর্ট করতে পারবে না।

ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি সাঈদ আহমেদ খানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হাসান জাবেদের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান, আলোচনায় অংশ নেন ডেইলি অবজারভারের অনলাইন সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোখলেছুর রহমান বাদল প্রমুখ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ পাওয়া