ফিচার - জানুয়ারি ১৩, ২০১৯

এক সমস্ত’র জীবন গল্প

আশিকুর রহমান, কুড়িগ্রাম ॥ সমস্ত বানু এক সংগ্রামী নারীর নাম। কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের বহরের ভিটা এলাকায় বসবাস করছেন ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিকে নিয়ে। পুতুল খেলার বয়সে বিয়ে হয় ১৯৮০ সালে উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের ঠুডাপাইকর নামক গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর সাথে। ১৫ বছর বয়সে জন্ম নেন একমাত্র ছেলে সন্তান। সন্তান জন্মের পর থেকেই সমস্ত বানুর সংসারে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো কোন না কোন ভাবেই। অবশেষে সমস্ত বানুর সমস্ত খরচ বন্ধ করেন স্বামী মোহাম্মদ আলী।

কুল না পেয়ে সন্তানকে বুকে আকড়ে ধরে চলে আসেন বাবার বাড়ি চিলমারী বহরের ভিটা গ্রামে। কিছুদিন বাবা-মায়ের সাথে থাকলেও বাবার মৃত্যুর পর ভাইদের সংসারে থাকা হয়নি বেশীদিন। ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে একা পথ চলতে শুরু করেন তিনি। প্রথমে চাতালের কাজ, তারপর রাস্তায় মাটিকাটাসহ বিভিন্ন কাজ করে পেটের ভাত যোগার করতেন সমস্ত বানু। এরই মধ্যে বহরের ভিটা ডিপের পার নামক গ্রামে সরকারী খাস জমিতে আশ্রয় গড়েন তিনি। যেখানে এখন থাকছেন ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিসহ নিজে।

৮বছর আগে জানতে পারেন থানাহাট বাজারের মহিলা বিপনী বিতানে চলছে দোকান বরাদ্দ। আবেদন করলেন থানাহাট ইউনিয়ন পরিষদে। ভাইভায় বোর্ডে ডাক পরলো তাঁর এবং বরাদ্দ পেলেন একটি দোকান ঘর। আবারো শুরু নিজের পায়ে হাঁটা। তবে এবার একটু অন্য ভাবে। শুরু করলেন ছোট্ট একটি চা বিস্কুটের দোকান। দোকানের নাম দেন দুই নাতির নামে তাজিম তামিম টি স্টল এন্ড ব্রেড।

এখন প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানে চা, পান, রুটি, বিস্কুট বিক্রি করেন সমস্ত বানু। দিন শেষে মহাজনকে মিটিয়ে লভ্যাংশ থাকে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে দিনাতিপাত করছেন সমস্ত বানু। শুধু তাই নয় এর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য পুঁজিও গড়ছেন এই আয় থেকে।

প্রথমের দিকে দোকানে কেউ না আসলেও এখন নিয়মিতই মানুষজন আসছেন এবং খাচ্ছেন বলে জানান তিনি। সাঈদ নামের এক ক্রেতার সাথে কথা হলে তিনি জানান, প্রথমে এই দোকানে তেমন আসতাম না, এখন দেখি অন্য দোকানের থেকে এই দোকানের সব কিছু পরিষ্কার, দোকানিও পরিষ্কার পরিপাটি। তাই এখানে খাবার খেয়ে তৃপ্তি পাই এজন্য আমি নিয়মিত আসি এবং আমার সাথের অন্যদেরও নিয়ে আসি।

এই দোকান থেকে উপার্জন করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি হওয়ায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২০১৮ জয়িতা সম্মাননা পান এই নারী। এই সম্মাননা পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে তিনি বলেন, এই সম্মাননা পেয়ে আমি খুউব খুশী। কুড়িগ্রামে পেয়েছি, চিলমারীতে পেয়েছি খুব ভালো লাগছে। এখন আগের তুলনায় কাজের গতি অনেক বাড়ছে।
সমস্ত বানুর ছেলে নজরুল সংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী আনোয়ারুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমিও অনেকগুলো পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছি, সে অর্জনগুলোতে যতটা ভালো লাগেনি তার চেয়ে মা জয়িতা সম্মাননা পাওয়ায় বেশি ভালো লাগছে। তবে আমি এই কথা বলতে চাই একটা মানুষ কষ্ট করলে তার সফলতা আসে। তার উদাহরণ আমার মা।

সমস্ত বানু বলেন, আমার স্বামী আমাকে খরচ দেয় না, তাতে আমার কোনো কষ্ট নেই। এখন আমি নিজেই সাবলম্বী। পেটের খাবারের জন্য কারো কাছে হাত পাততে হয়না কখনো। শুধু কষ্ট হচ্ছে সে যদি আমার ছেলে, নাতি-নাতনির দিকে তাকাতো কিংবা তাদের পাশে দাঁড়াতো তাহলে আমার ছেলে এবং নাতি নাতনিরা তাদের দাদার আদরটা অন্তত পেতো। সে বেঁচে থাকার পরেও আমার সন্তানদের কাছে মৃত। কারণ তার উপস্থিতি নেই। সে রোজগার করতে পারে না ঠিক আছে, যদি তাঁর প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার কিছু অংশ ছেলেকে দিতো তাতেও আমি সন্তুষ্ট হতাম।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সমস্ত বানুকে রেডিও চিলমারী খুঁজে বের করে জয়িতা অন্বেষণ ২০১৮ কার্যক্রমে আবেদন করায়।


আরও পড়ুন

২ Comments

Comments are closed.