রাজনীতি - জানুয়ারি ১৪, ২০১৯

উপজেলায় যাচ্ছেন না বিএনপির সেই চেয়ারম্যানরা

ছিলেন পৌরসভার মেয়র বা উপজেলা চেয়ারম্যান। হতে চেয়েছিলেন সংসদ সদস্য। নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায়। জাতীয় নির্বাচন শেষ হলেও এখনো কেউ তার আগের দায়িত্বে ফিরে যাননি। এর একটি কারণ, তাদের পদ আছে কি নেই তা নিয়ে বিভ্রান্তি।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এই জনপ্রতিনিধিদের পদত্যাগপত্রের বিষয়ে এখানো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। আর তারা কেউ চেয়ারে না বসায় বেশ কিছু কাজ আটকে আছে।

গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের ভোটে দাঁড়াতে মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময় ছিল গত ২৮ নভেম্বর। আর এর আগে আগে স্থানীয় সরকারের পদ ছেড়ে যারা পদত্যাগ করেন, তাদের প্রায় সবাইকেই ভোটে অযোগ্য ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ২ ডিসেম্বরের এই আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে এদের প্রায় সবাই ফিরেও পেয়েছিলেন প্রার্থিতা। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা উচ্চ আদালতে যান এবং আদালত আটকে দেয় তাদের ভোটের পথ।

আইন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের পদে থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বাধা আছে। আর পদত্যাগ করলেই কেবল হবে না, তা গৃহীতও হতে হয়। আর এখানেই আটকে অন্তত ১৫ জন উপজেলা চেয়ারম্যানের ভোটে লড়ার বাসনা।

এদের মধ্যে বিএনপি প্রার্থী ছিলেন ১২ জন যাদের ১০ জন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং দুই জন ছিলেন পৌর মেয়র। তিনজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

পদ হারানো উপজেলা চেয়ারম্যানরা জানেন না তারা আর জনপ্রতিনিধি আছেন কি না। কেউ কেউ তাদের পদ ফিরে পেতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তারা (উপজেলা চেয়ারম্যান) পদত্যাগপত্র দিলেও সেটি এখনো গৃহীত হয়নি।’

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে খন্দকার আবু আশফাক ঢাকা-১, ধামরাইয়ের উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে তমিজ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা-২০ আসনে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন তাদের মার্কা বরাদ্দ দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের আবেদনে প্রথমে হাইকোর্ট এবং পরে আপিল বিভাগ তাদের প্রার্থিতা স্থগিত করে।

একই ঘটনা ঘটেছে জামালপুর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম (সরিষাবাড়ী উপজেলার চেয়ারম্যান), নরসিংদী-৩ আসনের মঞ্জুর এলাহী (সদর উপজেলা চেয়ারম্যান), বগুড়া-৭ আসনের মোরশেদ মিল্টন (গাবতলী উপজেলা চেয়ারম্যান), জয়পুরহাট-১ আসনের ফজলুর রহমান (সদর উপজেলার চেয়ারম্যান), রাজশাহী-৬ আসনের আবু সাঈদ চাঁদ (চারঘাট উপজেলার চেয়ারম্যান, নাটোর-৪ আসনের আব্দুল আজিজ (বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের মোসলেম উদ্দিন (আখাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান), ঝিনাইদহ-২ আসনের আব্দুল মজিদের (হরিণাকু-ু উপজেলা চেয়ারম্যান) ক্ষেত্রে।

নীলফামারী-৪ আসনে ধানের শীষ পাওয়া আমজাদ হোসেন শেষ পর্যন্ত ভোটে লড়তে পারেননি সৈয়দপুর পৌর মেয়রের পদ ছাড়ার চিঠি গৃহীত না হওয়ায়। দিনাজপুর-৩ আসনের সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ভোটে দাঁড়াতে পারেননি দিনাজপুর পৌরসভার মেয়রের পদ ছাড়ার চিঠি গ্রহণ না হওয়ায়।

রংপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আসাদুজ্জামান বাবলু গঙ্গাচড়া, ময়মনসিংহ-৮ আসনের বিদ্রোহী মাহমুদ হাসান সুমন ঈশ্বরগঞ্জ এবং পিরোজপুর-৩ আসনের বিদ্রোহী আশরাফুর রহমান মঠবাড়িয়া উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছাড়ার চিঠি দিয়েই নামের ভোটের লড়াইয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি তারাও।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান এ জন্য দায়ী করছেন নির্বাচন কমিশনকে। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ বা অবৈধ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের। সেই কমিশন প্রার্থীর বৈধতা ঘোষণা করার পরেও দেখা গেল আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালত যা করেছে, সেটা আইনের ভিত্তিতেই করেছে। তাই যদি হয়, তবে নির্বাচন কমিশনের তো সে আইন জানার কথা ছিল। নির্বাচন কমিশনের এমন অজ্ঞতা তো কারও ভোাগান্তির কারণ হতে পারে না।’

বগুড়া-৭ আসন থেকে ভোটে লড়তে না পারার পর গাবতলী উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ হারানো মোরশেদ মিল্টন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করেই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছি। কেন গৃহীত হলো না তার কারণ জানি না। এটাতো ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু না। তবে এর বিরুদ্ধে আইন লড়াই করব। এখন আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

আগের উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ বহাল আছেন কি না জানেন না ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন থেকে ধানের শীষে লড়তে না পারা মোসলেম উদ্দিন। বলেন, ‘২৭ নভেম্বর পদত্যাগ করে ২৮ নভেম্বর তা জমা দিয়ে এমপি পদে নির্বাচন করতে মনোনয়ন দাখিল করেছিলাম। এরপর আর উপজেলায় যাইনি। আমার জানামতে এখনো ওই পদে কাউকে বসানো হয়নি।’

চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছাড়া আবু সাঈদ চাঁদ গত বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হন একটি মামলায়। তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে কি না, সেটা জানেন না উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হক। বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আবু সাঈদ চাঁদ কারাগার থেকেই পদত্যাগ করেছেন বলে শোনা যায়। তবে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিঠিপত্র আমার কাছে আসেনি।’

গত সেপ্টেম্বরে চাঁদ গ্রেপ্তারের পর থেকেই মন্ত্রণালয়ের আদেশে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারী ভাইস চেয়ারম্যান তাহমিনা বেগম।

নরসিংদী সদর উপজেলা পদত্যাগী চেয়ারম্যান মঞ্জুর এলাহী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পদত্যাগ করার পর আর উপজেলায় যাইনি। আমার জানামতে কেউ এখনো এ পদে দায়িত্ব পায়নি।’

নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম জামেরি হাসান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ওনার পদত্যাগপত্র পেয়েছি এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তবে সেটা গৃহীত হওয়ার বিষয়ে কোনো চিঠি আসেনি। ফলে আইন অনুযায়ী এখনো ওনি চেয়ারম্যান আছেন। তবে উনি আসেন না। যদি প্রয়োজন পরে তাহলে ওনাকে দিয়েই কাজটা করাব।’

জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে চিঠি দেওয়া ফরিদুল কবির তালুকদার শামীমও আর উপজেলায় যাননি। এবার ভোটেও লড়বেন না। বলেন, ‘আর উপজেলা নির্বাচন করছি না। যদি দল চায় তবে আগামীতে সংসদ নির্বাচন করব। কাউকে উপজেলায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানি না।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে নাকি হয়নি, সে ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা আমাদের দেয়নি। তবে তিনি আসেন না।’

যদি পরিপত্র জারি হয় তাহলে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। আর না হলে তিনিই চেয়ারম্যান থাকবেন।

নাটোর-৪ আসনে ধানের শীষ পেয়েও ভোট থেকে দূরে থাকা আব্দুল আজিজ আশা করছেন, তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ফিরে পাবেন। বলেন, ‘যেহেতু আমার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি, সেহেতু আমার চেয়ারম্যানের পদও বহাল রয়েছে।’

ঝিনাইদহ-২ আসনে ভোটে লড়তে না পারা হরিণাকু- উপজেলার আবদুল মজিদ বলেন, ‘যেহেতু মন্ত্রণালয় পদত্যাগত্র গ্রহণ করেনি, আমি মনে করি, এখনো চেয়ারম্যান আছি। তবে অফিসে যাই না।’


আরও পড়ুন