দূর পরবাস - January 27, 2019

বাংলাদেশি পতাকা হাতে ১২৫ দেশে নাজমুন নাহার

তিন মাস ধরে পশ্চিম আফ্রিকার ১৫টি দেশে ভ্রমণ করেছেন বাংলাদেশি পর্যটক নাজমুন নাহার। এর আগে তার দেখা ছিল ১১০টি দেশ। এবার পশ্চিম আফ্রিকায় সাহারা মরুভূমির আশেপাশের এই দেশগুলো যোগ করার পর তার ভ্রমণ করা মোট দেশের সংখ্যা দাঁড়ালো ১২৫।

যেখানেই গেছেন তিনি, সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশের পতাকা। কোনো বাংলাদেশি নারীর বিশ্ব ভ্রমণে নিঃসন্দেহে এটা একটা রেকর্ড। তিনি জানালেন, এখানেই শেষ নয়। এই জীবনে বিশ্বের সবকটি দেশই ঘুরে দেখার ইচ্ছে আছে তার।

নাজমুন নাহারকে জিজ্ঞেস করলাম মাথার এই হেয়ার ব্রেইড তিনি কোথায় করিয়েছেন? বললেন, টোগোতে। স্থানীয় চারজন নারী মিলে কোকরানো চুলের এই বেণি তৈরি করে দিয়েছে। এর পেছনে কারণ দুটো- প্রথমত, যেখানেই গেছেন সেখানকার মানুষের মতো রূপ নিতে চেয়েছেন তিনি, যাতে স্থানীয় লোকজন তাকে আপন করে নেয়।

এরকম হলে ওই দেশের সংস্কৃতিকে বোঝা সহজ হয়। বিদেশি কোনো পর্যটক যখন বাংলাদেশে এসে আমাদের শাড়ি কিম্বা লুঙ্গি পরেন, আমরাও তো অনেক খুশি হই, তাই না? এ কারণে ওরাও আমাকে খুব আপন করে নিয়েছে।

আর দ্বিতীয় কারণ হলো: নিরাপত্তা। বিশেষ করে নারীদের। আমার মনে হলো আমাকে যদি ওদের মতো দেখায় তাহলে হয়তো অনেক ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতে পারবো।

একেকটি দেশে গিয়ে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোতে যাওয়ার ভিসা নিয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল সময় ও অর্থের সাশ্রয়। কখনো বাইকে, ভেঙে ভেঙে, কখনো ট্যাক্সিতে বা গাড়িতে, আবার কখনো মিনিবাসে এবং হেঁটে হেঁটে তিনি এসব দেশের সীমান্ত পার হয়েছেন।

এসব দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো এত দুর্গম যে বেশিরভাগ সময় বাইকে যেতে হয়েছে। পাঁচ থেকে ছ’ঘণ্টার পথের জন্যে বাইক ভাড়া করতাম। চালক সামনে আর ব্যাক-প্যাক নিয়ে আমি বসতাম পেছনে।

তিনি জানান, কখনো কখনো তাকে বাইক থেকে নেমে পায়ে হেঁটে কিছুটা পথ যেতে হতো। হাঁটু পানি ডিঙিয়ে গর্ত পার হয়ে যেতেন তিনি। এ সময় তাকে অনেক পোকামাকঙের কামড়ও খেতে হয়েছে।

গিনি বিসাউ সীমান্ত পার হয়ে গিনি কোনাক্রি যাওয়ার পথে আমি ২২ ঘণ্টা আটকে ছিলাম। রাত তখন তিনটা। হঠাৎ করে আমাদের গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। আমরা ন’জন প্যাসেঞ্জার ছিলাম। দু’পাশে গভীর জঙ্গল আর ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি শুনেছি যে, এর আগে এখান থেকে বহু মানুষ অপহূত হয়েছিল।

তখন তারা সবাই অন্ধকারে প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর একটি গ্রাম দেখতে পান। সেখানে ছিল কয়েকটি শনের ঘর। সেখানে গিয়ে বসে পড়লেন তারা। ভোরে বাড়ির ভেতর থেকে একজন মহিলা বের হয়ে এলেন। তারা আমাদেরকে আশ্রয় দিলেন। খাবার দিলেন।

নাজমুন নাহার বলেন, বেশ কয়েকবারই ধূলিঝড়ে পড়েছিলেন। সব জায়গায় ঠিক মতো খাওয়ার পানিও পাওয়া যায় নি। কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলেন জঙ্গলের ভেতরে। কয়েক ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করে আবার পথ খুঁজে পেয়েছেন।

কোথাও দেখা গেল যে হয়তো দশটা গ্রামের মানুষ মিলে একটা টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করছে। কোথাও কোথাও পানির সংকট এতটাই প্রকট ছিল যে পানি না পেয়ে আমি গাছ থেকে মাল্টা পেড়ে তার রস খেয়ে পানির তৃষ্ণা মিটিয়েছি।

তিনি জানান, আফ্রিকার এসব দেশে গ্রামে-গঞ্জের লোকেরা বাংলাদেশকে চিনতে না পারলেও প্রায় সবকটি প্রধান শহরের লোকেরাই বাংলাদেশকে কম বেশি চেনে। তার একটি কারণ হচ্ছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশি সৈন্যদের ভূমিকা।

যেমন সিয়েরা লিয়ন, লাইবেরিয়া এবং আইভোরি কোস্টের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশের সৈন্যরা প্রচুর কাজ করেছে। তারা বলে যে যুদ্ধের সময় তোমাদের সৈন্যরা আমাদেরকে রক্ষা করেছে। এই তিনটি দেশের মাটিতে পা দিয়েই অনুভব করতে পেরেছি এখানকার মানুষ বাংলাদেশকে প্রচণ্ড রকমের শ্রদ্ধা করে।

এর আগে তার দেখা ১১০টি দেশের সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার এই ১৫টি দেশের তফাত কোথায়- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও দুর্গম পথ আমি সেখানেই পাড়ি দিয়েছি। তবে তিনি বলেন, জীবনের কঠিন সংগ্রামকে নতুন করে চিনতে পেরেছেন।

‘বুরকিনা ফাসোতে দেখেছি মেয়েরা তাদের পেছনে ছোট্ট একটা সন্তানকে কাপড় দিয়ে বেঁধে বাইক চালাচ্ছে। তাদের মাথার ওপর একটা ঝুড়িতে রাখা শাক সব্জি। বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। নারীরা সেখানে প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। তারা দরিদ্র হলেও হূদয়টা অনেক বড়।’

তিনি জানান, তার এর পরের গন্তব্য মধ্য আফ্রিকা। কয়েক মাস বিরতি দিয়ে তিনি যাবেন সেখানে এবং তখনই সম্পন্ন হবে তার আফ্রিকা দর্শন। সূত্র- বিবিসি।


আরও পড়ুন

1 Comment

  1. Its like you read my mind! You appear to know so much about this, like you wrote the book in it or something. I think that you can do with some pics to drive the message home a little bit, but instead of that, this is fantastic blog. An excellent read. I will definitely be back.

Comments are closed.