ভ্রমণ - ফেব্রুয়ারি ৩, ২০১৯

ঘুরে আসুন রাজশাহী

রাজশাহী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের (উত্তরবঙ্গের) একটি প্রধান শহর। এটি রাজশাহী বিভাগ এর রাজশাহী জেলার অন্তর্গত। রাজশাহী শহর বিখ্যাত পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত।রাজশাহী শহরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানরয়েছে যাদের অনেকগুলির খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। নামকরা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য রাজশাহী শহর শিক্ষানগরী নামেও পরিচিত।

গাছে গাছে সেখানে কাঁচা-পাকা আম। হাটে বাজারে আমের মেলা। তাই এটি আমের রাজধানী। রাজশাহী শহরে এবং এর আশেপাশে বেশ কিছু বিখ্যাত ও দর্শশনীয় ঐতিহাসিক মসজিদ, মন্দির ও উপাসনালয় রয়েছে।দুএক দিনের সময় নিয়ে তাই ঘুরে আসুন রাজশাহী থেকে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার তীরঘেষে প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে গড়ে ওঠা শান্তিপ্রিয় এক নগরী। ৮টি জেলা নিয়ে গড়ে উঠেছে রাজশাহী বিভাগ। শান্তির নগরী, শিক্ষানগরী এবং রেশম এ নগরীর রসাল আমের কথা না-ই বা বললাম! রাজশাহী শহরের প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলো হল:সাহেববাজর, রানীবাজার, রেশমপট্টি, ঘোড়ামারা, হেতেমখা, দরগাপাড়া, কুমারপাড়া, বোয়ালিয়া ইত্যাদি। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এ শহরের নাম লোকমুখে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। রেশম ছিল এর মূল কারণ। ফলে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে রাজশাহী গুরত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আপনার ঘুরে বেড়ানোর জন্য রাজশাহী হতে পারে চমৎকার একটি জায়গা।

কোথায় বেড়াবেনঃ- 

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর: রাজশাহী ভ্রমণের শুরুতেই দেখে দিন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। এ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা মিলবে। রাজশাহী সদর হাপতালের সামনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন সংগ্রহশালা বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। ১৯৬৪ সালে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের দায়িত্ব বর্তায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। আটটি গ্যালারিতে প্রায় দেড় হাজার প্রস্তর ও ধাতব মূর্তি, দুই হাজারেরও বেশি প্রাচীন মুদ্রা, প্রায় এক হাজার পোড়ামাটির ফলক ছাড়াও হাজারো নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে এ জাদুঘরে।


এপ্রিল থেকে অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত, নভেম্বর থেকে মার্চ সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার খোলা থাকে দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত ছুটির দিনে এটি বন্ধ থাকে।

পদ্মার তীর: শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা। যে সময়ই হোক না কেন, পদ্মার তীর আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এখানে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃদুমন্দ বাতাসের সাথে ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। এছাড়াও পদ্মা বুকে নৌকা ভ্রমণ এবং বিজিবি কর্তৃক পরিচালিত স্পিড বোড রাইডিং উপভোগ করতে পারবেন।

হযরত শাহমুখদুম (র.) মাজার: রাজশাহী কলেজের কাছে দরগা পাড়ায় পদ্মার তীরঘেষে গড়ে ওঠা দরগাপাড়ায় অবস্থিত মাজারটি রাজশাহীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ন স্থান। এ অঞ্চলের দরবেশ পুরুষ শাহ মখদুমের (র) সমাধি। ১২৮৭ সালে তিনি বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসেন। ১৩১৩ সালে চিরকুমার এ দরবেশ মৃত্যুবরণ করেন। আর ১০ মহররম এখান থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল।


কেন্দ্রীয় উদ্যান এবং চিড়িয়াখানা:  পদ্মার তীর ঘেষে গড়ে ওঠা অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। অনেক দেশি-বিদেশী পশু-পাখি, বিভিন্ন প্রজাতির গাছসহ বাচ্চাদের জন্য রাইডিং, হেলিপ্যাড ও ছোট পাহাড় নিয়ে অবস্থিত।

টি বাঁধ:রাজশাহী শহরের পাশে পদ্মার তীরে ইংরেজি ‘টি’ আকৃতির বাঁধ এখন শহরের অন্যতম বেড়ানোর জায়গা। পদ্মার শীতল বাতাসের পরশ নিতে প্রতিদিন বহু মানুষ এখানে জড়োহন। এখান থেকে নৌকা ভাড়া করে ঘুরে আসতে পারেন পদ্মার কোনো চর।


বিসিক শিল্প এলাকা:শহরের বিসিক শিল্প এলাকায় আছে বেশ কিছু রেশম শিল্প। পোকা থেকে রেশম তৈরির কলাকৌশল দেখতে পাবেন এখানে। তুলনামুলক কম দামে এখান থেকে রেশমের কাপড়ও কেনা যায়।


স্মৃতি অম্লান: শহীদ ক্যাপ্টেন বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সড়কের ভদ্রা এলাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধের এ স্মৃতিসৌধ। রাজশাহীর কেন্দ্রস্থলে নির্মিত ১৯৯১ সালের ২৬ মার্চ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। স্থপতি রাজিউদ্দিন আহমদ। সৌধে মোট তিনটি স্তম্ভ আছে। প্রতিটির গায়ে ২৪টি করে ধাপ। যেগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত আন্দোলনের ক্রমবিবর্তন ও স্বাধীনতার ফসল। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের নির্দেশ করা হয়েছে স্তম্ভের গায়ের ৩০টি ছিদ্রের মাধ্যমে। প্রতিটি স্তম্ভে রয়েছে ১০টি করে ছিদ্র। বেদিমূলে রাখা আছে নীল শুভ্রপাথরের আচ্ছাদন। যা দুই লাখ নির্যাতিত নারীর বেদনাময় আর্তির কথা ইঙ্গিত করে। সৌধের চূড়ায় রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রের লালগোলক। যা স্বাধীনতা যুদ্ধের উদীয়মান লাল সূর্যের প্রতীক।

শহীদ জিয়া পার্ক: মনোরেল, বাম্পিং কার সহ বেশ কিছু মজাদার রাইড সহ শহরের নিকটে নওদাপাড়া এলাকায় এই বিনোদন কেন্দ্রটি অবস্থিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস:রাজশাহী শহরের পাশে অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এর ছায়া ঘেরা ক্যাম্পাসে বেড়াতে ভালো লাগবে সবার।

সাবাশ বাংলাদেশ:মুক্তিযুদ্ধের এই স্মারক ভাস্কর্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার সবুজ চত্বরে মুক্তাঙ্গনের উত্তরপাশে অবস্থিত। রাকসু এবং দেশের ছাত্রজনতার অর্থ সাহায্যে শিল্পী নিতুন কুন্ড এই ভাস্কর্যটি বিনা পারিশ্রমিকে নির্মাণ করেন। ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ উদ্বোধদন করেন। ভাস্কর্যে দুজন মুক্তিযোদ্ধার একজন রাইফেল উঁচু করে দৃপ্ত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে, অন্যজন রাইফেল হাতে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে। ভাস্কর্যের পিছনে ৩৬ ফুট উঁচু একটি দেয়াল। দেয়ালের ওপরের দিকে সূর্য প্রতীকে একটি শূন্য বৃত্ত। বেদির উভয় পাশে রয়েছে ছয় ফুট বাই পাঁচ ফুট দুটি রিলিফ প্যানেল।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ: মেডিকেল স্থাপিত হয় ১৯৫৮ইং সালে বাংলাদেশে ৬ টি মেডিকেল কলেজ বৃটিশ স্বীকৃত এর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট): শহরের পূর্ব দিকে অবস্থিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঘেষা রুয়েট সুবিসাল জায়গা নিয়ে অবস্থিত। রুয়েট স্থাপিত হয় ১৯৬৪ সালে।

কাশিয়া ডাংগা: এখান থেকে শুরু করে চাপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত রয়েছে সুবিস্তৃত আম বাগান।

বাঘা মসজিদ:  পঞ্চাশ টাকার নোটে যে মসজিদটি দেখতে পান সেটিই হলো রাজশাহীর ঐহিত্যবাহী বাঘা মসজিদ। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪০কিমি পুর্বে অবস্থিত।

পুঠিয়া রাজবাড়ী: রাজশাহী শহর থেকে ৩০কিমি পুর্বে অবস্থিত পুঠিয়ায় গেলে দেখতে পাবেন পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ শিবমন্দীর সহ অসংখ্য পুরা কীর্তি।

সারদা পুলিশ একাডেমী: রাজশাহী থেকে ৩০ কিমি দুরে পদ্মার তীরবর্তী সারদায় রযেছে পুলিশ প্রশিক্ষন কেন্দ্র।

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ: পুলিশ একাডেমীর কাছেই রয়েছে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ।

যেভাবে যাবেন- আকাশপথ, রেলপথ, সড়কপথ এবং জলপথে রাজশাহীতে যেতে পারেন।

আকাশপথ: শাহমুখদুম বিমানবন্দর। রাজশাহী শহরের নিকটবর্তী নওহাটায় অবস্থিত বিমান বন্দরটি রাজধানী ঢাকার সাথে রাজশাহীকে আকাশ পথে যুক্ত করেছে।

সড়কপথ: রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় প্রতি আধা ঘন্টায় একটি করে বাস ছাড়ে রাজশাহী উদ্দেশ্যে। রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বাস সার্ভিসগুলোর অন্যতম: ১. হানিফ এন্টারপ্রাইজ ২. ন্যাশনাল ট্রাভেলস ৩. দেশ ট্রাভেলস ৪. শ্যামলী পরিবহন ৫. গ্রামীন ট্রাভেলস।ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে ন্যাশনাল ট্রাভেলস ও দেশ ট্রাভেলসের এসি বাস যায় রাজশাহী। ভাড়া ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। নরমাল বাস ভাড়া ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকা।

রেলপথ: সিল্ক সিটি, ধূমকেতু ও পদ্মা এক্সপ্রেস, রেলপথে ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার অন্যতম আধুনিক আন্ত:নগর রেল ব্যবস্থা। সিল্কসিটি ঢাকা থেকে দুপুর ২.৪০ মি. এ ছেড়ে যায়। এবং রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়ে সকাল ৭.৩৫ মি. এ।ভাড়া এসি বার্থ  টাকা। এসি সিট ৭৮০ টাকা। স্নিগ্ধা ৬৫৬ টাকা। শোভন চেয়ার ৩৪০ টাকা।

স্থানীয় যোগাযোগ: শহরের মধ্যে ঘুরতে হলে সর্বোত্তম বাহন হলো রিকশা। এছাড়াও ব্যাটারী চালিত অটো-রিক্সা সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী।

কেনাকাটা: সাহেব বাজার, আরডিএ মার্কেট, কাপড়পট্টি, নিউমার্কেট, থিম ওমর প্লাজা  থেকে আপনার দরকারী জিনিসগুলো কিনে ফেলতে পারেন।

কোথায় খাবেন: চাইনিজ: নানকিং চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এবং কুকিজার রয়েছে পদ্মার তীরবর্তী মনিবাজারে। সাফাওয়াং রয়েছে গ্রেটার রোডে। চিলিস রয়েছে সাহেব বাজারে। দেশী খাবারের জন্য “হিলসা”রয়েছে বাটার মোড়ে এবং হোটেল রহমানিয়া রয়েছে মালোপাড়ায়। মিষ্টির জন্য “রাজশাহী
মিষ্টান্নভান্ডার”এর তুলনা আর নেই।

থাকবেন কোথায়:   এ শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের বেশ কিছু হোটেল আছে। এসব হোটেলে ২শ’ থেকে ৪ হাজার টাকায়বিভিন্ন মানের রুম পাওয়া যাবে। অন্যতম হোটেলগুলো হল: রাজশাহী চিড়িয়াখানার সামনে পর্যটন মোটেল, সাহেববাজারে হোটেল মুক্তা ইন্টারন্যাশনাল, বিন্দুরমোড় রেল গেইটে হোটেল ডালাস ইন্টারন্যাশনাল, গণকপাড়ায় হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনাল, মালোপাড়ায় হোটেল সুকর্ণা ইন্টারন্যাশনাল, সাহেব বাজারে হামিদিয়া গ্রান্ড হোটেল, শিরোইলে হকস্ ইন, লক্ষীপুর মোড়ে হোটেল গ্যালাক্সি, সাহেব বাজারে হোটেল নিউ টাউন ইন্টারন্যাশনাল। আপনার ভ্রমণ আনন্দময় হোক।


আরও পড়ুন