মুক্তকলাম - মার্চ ২৯, ২০১৯ ৭:১৮ অপরাহ্ণ

আগুনে দগ্ধ স্বজনের আত্মচিৎকার ও হারানোর ব্যথায় আর কত কাতর হবো আমরা?

বিগত সময়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ড সংগঠিত হয়েছে। এ সকল অগ্নিকান্ডেও মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। ইতোমধ্যে সকল ঘটনাকে ছাড়িয়ে গত ৩ জুন ২০১০ তারিখে পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড সংগঠিত হয়। এ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মারা যায় ১১৭ জন এবং দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল আরো ৩৯ জন এবং আহত দুই শতাধিক। স্মরণকালের এই অগ্নিকান্ডে বিপুল প্রাণহানির প্রেক্ষিতে সরকার জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে ছিল। এ ভয়াবহ দুঘর্টনা দেশের মানুষকে নিস্তদ্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় নিস্তব্ধ হয়ে যায় গোটা এলাকা। দেশের এত মানুষের মৃত্যুতে আমরাও হয়েছিলাম শোকাহত।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই অতি সম্প্রতি রাজধানীর চকবাজার থানা সংলগ্ন উর্দু রোডের চুড়িহাট্টায় বহুতল ভবনের কেমিক্যাল গোডাউন ও আরও দুটি ভবনে ভয়াবহ আকস্মিক অগ্নিকান্ডে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে এদের মধ্যে ২০ জন দগ্ধ হয়েছে। তাদের ১৬ জনকে দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও চারজনকে দগ্ধ অবস্থায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের তথ্যানুযায়ী, দগ্ধদের একজনের ৬০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। বাকিদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। এছাড়া লাফিয়ে নামতে গিয়ে কেউ কেউ হাত-পা ভেঙ্গেছেন। কারও মুখমন্ডল ও শরীরের বিভিন্নস্থানে মারাত্মক জখম হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সূত্র অনুযায়ী, র্বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন উর্দু রোডে চুড়িহাট্টা পাঁচতলা আবাসিক ভবনে ও তার নিচতলার একটি কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৩৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ফায়ার সার্ভিস কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনে। এরপর হঠাৎ আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ওই পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে থাকায় আগুন হঠাৎ বেড়ে ওঠে। এতে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণ আনতে বেগ পেতে হয়েছিল। আগুন আশপাশের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভবনগুলো খালি করে সেখানকার বাসিন্দাদের অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

ঐ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব কে প্রধান করে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, রাসায়নিক নয়, বরং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, আর ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে যে ৫২ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৪১ জনই প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।

হাসপাতালে ভর্তি অগ্নিদগ্ধ কোন রোগী থেকে কেমিকেলের চিহ্ন অথবা গন্ধ পাওয়া যায়নি এবং অগ্নিদগ্ধ দেহগুলো ‘ড্রাই ফ্রেম’-এ দগ্ধ ছিল – বলছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঐ প্রতিবেদন।

অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শগুলো হলো- রান্নার পর চুলার আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে রাখা। বিড়ি বা সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ নিভিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেলা। ছোট ছেলেমেয়েদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে বিরত রাখা। খোলা বাতির ব্যবহার কমিয়ে দেয়া। অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা নিয়মিত ভবনের বৈদ্যুতিক ক্যাবল ও ফিটিংস পরীক্ষা করা। হাতের কাছে সব সময় দুই বালতি পানি বা বালু মজুদ রাখা। বাসগৃহ, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি নির্বাপণী যন্ত্রপাতি স্থাপন করা এবং প্রয়োজন মুহুর্তে তা ব্যবহার করা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হতে অগ্নি প্রতিরোধ, নির্বাপণ, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা। প্রতিটি শিল্পকারখানা ও সরকারি-বেসরকারি ভবনে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ ও বিধিমালা-২০১৪ অনুযায়ী অগ্নি-প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা। স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের ফোন নম্বর সংরক্ষণ করা এবং যে কোন জরুরি অবস্থায় সাহায্যের জন্য সংবাদ দেয়া। রোগী পরিবহনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এ্যাম্বুলেন্স সেবা গ্রহণ করা, ইত্যাদি।

সর্বশেষ গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীর ২২ তলা বিশিষ্ট এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এক শ্রীলঙ্কান নাগরিকসহ অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্তাব্যক্তিরা। দমকল বাহিনীর ঢাকা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মতে, মূলত যে দুইটি কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হয়েছে, তা হলো- ১) পানির অভাব- আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রচুর পানি দরকার হয়। এক সময় পানির যোগান এবং তা যথাস্থানে দ্রুত সময়ে পৌঁছানো একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়; ২) সিনথেটিক ফাইবার- ঐ ভবনের বেশিরভাগ তলায় রয়েছে বিভিন্ন অফিস, যেগুলো ডেকোরেট বা সজ্জার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সিনথেটিক ফাইবার। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে ফায়ার সা‌র্ভি‌সের ২২টি ইউ‌নিট।

বিগত, সম্প্রতি ও সর্বশেষ ঘটে যাওয়া অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশের মতে, অগ্নি নির্বাপনে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ও অগ্নি নির্বাপন এবং উদ্ধার কাজের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজন করা প্রয়োজন। তবে, এর পাশাপাশি যে বিষয়টি সমালোচিত হয়েছে, সেটি হলো, বিপুল সংখ্যক অতি উৎসুক জনতার দাড়িয়ে মুঠোফোনে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ! ফলে ঐসকল অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ের কারণে উদ্ধারকার্য বাধাগ্রস্থ হয়েছে। যেটি, আমাদের মূল্যবোধ ও বিবেকবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ঢাকা শহরকে আগামীর বাসযোগ্য করতে নতুন করে উদ্যোগের বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও আইনের সুষ্টু প্রয়োগ এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে এ নগরীকে পুনঃগঠন করতে হবে, যেন আগামী দিনে আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ স্বজনের আত্মচিৎকার আর হারানোর ব্যথায় আমাদেরকে এভাবে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে কাতর হতে না হয়।

সুমিত বণিক, উন্নয়নকর্মী।
মহাখালী, ঢাকা।