অষ্টগ্রাম - কিশোরগঞ্জের খবর - মার্চ ৩০, ২০১৯ ৭:৩০ অপরাহ্ণ

অবহেলা অযত্নে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি অষ্টগ্রামের বধ্যভূমি বালু ব্যবসায়ীর দখলে

স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও অষ্টগ্রামের বধ্যভূমি দুটি সংরক্ষিত হয়নি, স্থাপন করা হয়নি কোন নামফলকও। উপজেলার বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত দেওঘর ইউনিয়নের পাওনেরকান্দি এবং পূর্ব অষ্টগ্রামের ইকুরদিয়ায় দুটি বধ্যভূমির পাশে আজও স্বজনহারা পরিবারের লোকজন কখনো কাঁদেন, কখনো নীরবতা পালন করেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর হাওরে প্রচুর উন্নয়নের কর্মকান্ড হলেও বধ্যভূমি দুটি সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে চরম হতাশা আর ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে।

এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, পাওনেরকান্দি বধ্যভূমিটি অষ্টগ্রাম থানার মূল বধ্যভূমি ছিল। পাক হানাদার, আলবদর ও রাজাকারেরা অষ্টগ্রাম থানা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শতশত নারী পুরুষ ধরে এনে গুলি করে ও ব্যায়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করত। কিন্তু এই বধ্যভূমিটি বর্তমানে প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলে।

জানা যায়, বধ্যভূমি থেকে ভাগ্যক্রমে গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে ফিরে আসা পূর্ব অষ্টগ্রামের আব্দুল বাছির মৃত্যুর কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠের এ প্রতিনিধিকে জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় হঠাৎ করে একদিন তাকে ও তার বায়োবৃদ্ধ বাবা আব্দুল গণি মিয়াকে পাক বাহিনী ও রাজাকাররা তাদের বাড়ির সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায়। বাছির মিয়ার বড় ভাই আব্দুস সাহেদ মিয়া ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তার ছোট ভাই আব্দুল মতিন মাস্টার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের অপরাধ ছিল এসবই। সে কারণে পিতাপুত্রকে ধরে নেওয়ার পর সারাদিন থানায় আটক রেখে রাজাকাররা পাওনেরকান্দি বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়। তিনি জানান, সেখানে তারাসহ ২২ জনকে হত্যা করার জন্য একের পর এক গুলি করছিল আর ব্যায়নেট দিয়ে আঘাত করা হচ্ছিল। কিন্ত ভাগ্যক্রমে তিনি ও তার বায়োঃবৃদ্ধ পিতাকে ভোরবেলা এলাকাবাসী গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসা করান। এই করুণ দৃশ্য দেখার পর তার বৃদ্ধ বাবা মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। স্বাধীনতার কিছুদিন পর তিনি মৃত্যবরণ করেন। স্বাধীনতার পর এই বধ্যভূমিতে এলাকাবাসী শত শত মানুষের হাড়, কংকাল এবং মাথার খুলি পড়ে থাকতে দেখছেন বলে জানা গেছে। এদিকে উপজেলার জেলে অধ্যুষিত ইকরদিয়া গ্রামে ১৯৭১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শান্তি কমিটির নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা ভোরবেলায় ইকরদিয়া গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের উপর হামলা চালিয়ে দক্ষিণ পাড়ায় লুটপাট করে। তারা দুটি ধনাঢ্য বাড়িসহ সারা গ্রামে আগুন জ্বালায় ও লুটপাট করে। নির্যাতন চালিয়ে ৪৯ জন নারীপুরুষকে আটক করে একটি স্থানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

শহীদ পরিবারের সন্তান হরিমোহন দাস জানান, স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারিভাবে কোন শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ অথবা নাম ফলকও স্থাপন করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধ ক্ষোভের সাথে বলেন শুধুমাত্র জাতীয় দিবস আসলেই বধ্যভূমিতে মোমঁবাতি জ্বালান প্রশাসন এছাড়া আর কোনো কিছু হয় না এবং বধ্যভুমিতে বালুর ব্যবসা খুবই লজ্জা জনক ।

এ ব্যাপারে উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কাজী আফতাব উদ্দিন জানান, স্বাধীনতার প্রতিশক্তির প্রভাব এখনও বেশি তাই এখনও বধ্যভূমি দুটি সংরক্ষণ হচ্ছে না এবং স্বাধীনতার প্রতিশক্তিরাই পাওনেরকান্দি বধ্যভূমিতে বালুর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, এবার তো বেশ কয়েকটি বধ্যভূমি ব্যবস্থা হচ্ছে কিছু করছে এলজিইডি এবং কিছু করছে পি ডাব্লিও ডি তবে নির্বাহী কর্মকর্তার তালিকায় আছে কিনা দেখতে হবে। বালুর ব্যবসা সর্ম্পকে তিনি জানান বিষয়টি তিনি অবগত নন তবে খোজঁ খবঁর নিয়ে দেখবেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সালাহ উদ্দিন জানান, পাওনেরকান্দি বধ্যভূমির জায়গাটি মালিকানাধীন। সেখানে সরকারী জায়গা না থাকায় বধ্যভূমির জন্য প্রস্তাব পাঠানো যাচ্ছে না। তবে অধিগ্রহণের মাধ্যমে উপজেলার দুইটি বধ্যভূমি সরকারীভাবে ক্রয় করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে। বধ্যভূমিতে বালুর ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন, বধ্যভূমিতে নদীর তীরবর্তীতে সরকারী কিছু খাস জমি রয়েছে তবে মালিকানাধীন হওয়ায় একটু সমস্যা রয়েছে।