মায়ের কাছে ফেরা হল না ‘ফায়ার হিরো’ সোহেলের

পুড়তে থাকা এফ আর টাওয়ারে আটকা পড়া মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ফায়ারম্যান সোহেল রানার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনায় চলছে শোকের মাতম। প্রিয় সন্তানের অকাল মৃত্যুর শোকে কাতর মা হালিমা খাতুন ও বাবা নূরুল ইসলাম।

মৃত্যুর খবর পেয়ে সোহেল রানাদের বাড়িতে ভিড় করছে স্বজনেরা। চারদিকে যেনো কান্নার রোল। কে কাকে শান্তনা দেবে? এমন করুন মৃত্যু যে মেনে নিতে পারছেন না কেউ। এ দিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যাক্তিকে হারিয়ে বিপদের মুখে পড়েছে পরিবারটি।

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাঙ্গা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের দরিদ্র কৃষক নূরুল ইসলাম ও হালিমা খাতুনের ছেলে সোহেল রানা। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে রানা ২০১৫ সালে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে যোগ দেন।

সবশেষ গত ২৩ মার্চ বাড়ি এসেছিলেন তিনি। সেদিন ঢাকায় যাওয়ার সময় মাকে বলেছিলেন, ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে খুব শীঘ্রই বাড়ি আসবেন। তবে এবার তিনি জীবন থেকেই নিলেন লম্বা ছুটি। প্রিয় সন্তানের মৃত্যু খবরে বুক চাপড়ে মাতম করছেন তার মা-বাবাসহ স্বজনরা।

অতিদরিদ্র্য পরিবারের সন্তান সোহেল রানা ২০১০ সালে চৌগাঙ্গা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। কিন্তু টাকার অভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না তার। তাই অটো চালিয়ে আর প্রাইভেট পড়িয়ে ২০১৪ সালে করিমগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরের বছরেই যোগ দেন ফায়ার সার্ভিসে। বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইস রোগী। তাই তার আয় দিয়েই চলতো পরিবারের ভরনপোষণ ছাড়াও ছোট ভাইদের লেখাপড়া। এখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন স্বজনরা।

গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন রানা। ২৩ তলা ওই ভবনে আটকা পড়া মানুষদের ল্যাডারের মাধ্যমে নামাচ্ছিলেন তিনি। আটকেপড়াদের জায়গা করে দিতে সোহেল রানা লেডারের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। কিন্তু লেডারটি যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচের দিকে নেমে আসছিল, তখনই হঠাৎ সোহেল রানার পা মইয়ের ভেতরে আটকে গিয়ে ভেঙে কয়েক ভাগ হয়ে যায়। একই সময়ে চাপ লেগে তার পেট ছিদ্র হয়।

দুর্ঘটনার পরপরই সোহেল রানাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না। পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার।

সে কারণে সিএমএইচের চিকিৎসকদের পরামর্শে গত শুক্রবার রানাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে। পরে রবিবার (৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিটে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফায়ারম্যান রানা।


আরও পড়ুন