মুক্তিযোদ্ধার কথা - এপ্রিল ১৮, ২০১৯ ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

গ্রামের নাম সূর্যদী : নির্মম গণহত্যার নিশ্চুপ সাক্ষী

শেরপুর শহর ছাড়িয়ে ছোট্ট সাজানো ছিমছাম একটি গ্রাম। গ্রামের নাম সূর্যদী। একাত্তরে এই শেরপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল জামায়াত নেতা কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী। তা সত্ত্বেও কিছু গ্রামবাসী ভারতে না পালিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে রইলেন নিজের ভিটেতে।

সময় তখন ঠিক সকাল সাতটা। গ্রামবাসীর কেউ বাড়ির উঠানে শীতের মিঠা রোদ পোহাচ্ছেন, আবার কেউবা কৃষিকাজে ব্যস্ত। হঠাৎ সেই স্নিগ্ধ সকালের নীরবতা ভেঙ্গে দিয়ে গ্রামে প্রবেশ করলো পাকিস্তানীদের একটি জীপ,পেছন পেছন আরেকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য।

লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হানাদার বাহিনী ছুড়তে থাকে এলোপাথাড়ি গুলি। বিকট গর্জন আর ভাঙচুরের শব্দে গ্রামের মানুষ বাঁচার জন্য আশ্রয় নেন ঝোপ-জঙ্গল, ধানর ক্ষেত ও পানের বরজে। কিন্তু সেদিন তারা কাউকেই ক্ষমা করেনি। কারণ তারা তাদের বিশ্বস্ত পা চাটা কুকুর আলবদর সূত্র মারফত খবর পেয়েছে এই গ্রামে লুকিয়ে আছে কিছু মুক্তিযোদ্ধা। পুরো গ্রামের উপর তাদের ক্ষোভ। খুনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে পড়ে পাকবাহিনী। গানপাউডার ছিটিয়ে গ্রামের দেওয়ানবাড়ি, কিরসাবাড়ি ও বড়বাড়ির প্রতিটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়।

গ্রামের সকল যুবক-কিশোর,পুরুষকে লাইন ধরে দাঁড় করানো হয় স্থানীয় সরকারি প্রাইমারি স্কুল মাঠে। বাবা,ছেলে,ভাই সবাই আজ মৃত্যু মুখে। রক্তের নেশায় উন্মুখ হিংস্র হায়েনাদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে এ সময় নিজেদের নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সামনে এগিয়ে আসেন ছয় বীর মুক্তিযোদ্ধা।

তাঁরা হলেন ওই দিন আত্মগোপন করে থাকা এ গ্রামেরই বাসিন্দা গিয়াস কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব আলী, আবদুল খালেক, ফজলুর রহমান, হাবিবুর রহমান, মমতাজ উদ্দিন ও আবুল হোসেন। মাত্র ৪৫ রাউন্ড গুলি, এসএমজি আর কয়েকটি গ্রেনেড নিয়ে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন হানাদারদের ওপর। কিন্তু ততক্ষণে যে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

পাকিস্তানীদের ব্রাশ-ফায়ারে ঢলে পড়ে এক সাথে অর্ধ শতাধিক দেহ। নিভে যায় এই পরিবারের বহু পরিবারের আশা। স্বামী-হারা,সন্তানহারা মায়েদের এক ভূতুরে গ্রামে পরিণত হয় সূর্যদী। রচিত হয় আমাদের পূর্বপুরুষদের আরেকটি গৌরবময় আত্ম-গাঁথা।

এদিকে মাত্র ছয়জন মুক্তিযোদ্ধার অকস্মাৎ আক্রমনে ভীত-সন্ত্রস্ত পাকবাহিনী পিছু হটে। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এসে যোগ দেন কোম্পানি কমান্ডার গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে আরো দুটি দল। সম্মিলিত আক্রমণের মুখে হানাদাররা দ্রুত পিছু হটে। এ যুদ্ধেই শহীদ হন খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. আফসার আলী।

যুদ্ধ শেষ হবার পর এই গ্রামটিকে আর চেনবার কোন উপায় থাকেনা। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন,এদিকে ওদিকে ছড়িয় আছে মৃতদেহ। সর্বমোট ৬১ টি মৃতদেহ সেদিন মাটিচাপা দেন মুক্তিযোদ্ধারা। সেই গণকবরের স্মৃতি সাথে করে পাকিস্তানীদের আক্রমণে ধর্ষিত সূর্যদী দাঁড়িয়ে থাকে নির্যাতিত,নিপীড়িত আরো ছেষট্টি হাজার গ্রামের প্রতীক হয়ে।

আজো অদ্ভুত বিষন্ন সুন্দর এই সূর্যদী গ্রাম। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের পর মাঠে সবুজের সমারোহ। বোরো ধানের ক্ষেত দেখে মনে হয় যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে, যেখান থেকে উঠে আসবে আমাদের বেঁচে থাকার খোরাক। এই সবুজ জমিই একাত্তরে রঞ্জিত হয়েছিল লাখ লাখ বাঙালির রক্তে। তাদের স্মৃতি এখনও সজীব এবং থাকবে চিরকাল। আমরা ব্যর্থ হয়েছি কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম ঠিকই বের করে আনবে আমাদের গর্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তারা হয়তো এই সূর্যদী গণহত্যার শহীদদের জায়গা দেবে নিজেদের হৃদয়ে।

এই গ্রামের প্রতিটি পরিবারের রয়েছে স্বজন হারাবার বেদনা, রয়েছে গর্ব করার মত আত্মত্যাগের ইতিহাস। প্রতিবছর এই দিনে সেই সব শোকাতুর মানুষরা এক হন সূর্যাদী গণহত্যায় নিহত শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায়।