ফিচার - এপ্রিল ২৬, ২০১৯

আমার চোখে ফেরাউন!

ফেরাউন প্রাচীন মিশরীয় রাজ বংশের রাজাদের প্রচলিত উপাধি। ফেরাউন মূলত কারো নাম নয়। বনি ইসরাইলিদের যুগের ধর্ম যাজক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের উপাধি।

পরবর্তীতে বনি ইসরাইলিরা যখন রাজ্য শাসনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন যারা ঐ অঞ্চলের রাজা হতো তাদেরকে ফেরাউন বলে সম্বোধন করা হতো। প্রাচীন মিশরের নতুন রাজ্যের সময় ফেরাউনরা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা ছিল। ফেরাউনরা নিজেদেরকে সূর্যের বংশধর মনে করত। ফেরাউনরা মৃত্যুর পরও জীবন আছে বলে বিশ্বাস করত। তাই তাদের মৃত্যুর পর পিরামিড বানিয়ে তার নিচে সমাধিকক্ষে এদের দৈনন্দিন জীবনের ভোগ-বাসনার সমস্ত সরঞ্জাম রক্ষিত করত। মৃতদেহকে পচন থেকে বাঁচাবার জন্য তারা দেহকে মমি বানিয়ে রাখত এবং স্বর্ণালঙ্কারে মুড়ে সমাধিকক্ষের শবাধারে রাখা হত। ফেরাউনরা মৃত্যুর পর আরেকটি জীবনে বিস্বাসী ছিলো।

হজরত মুসা (সাঃ) এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- যিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় রামেসিস। ১৮৯৮ সালে লোহিত সাগরে থেকে ‘Ramsses 2nd’ ফেরাউনের দেহটি প্রথম উদ্ধার করা হয়।

বর্তমানে দেহটি মিশর যাদুঘরে (The royal gallery) রাজকীয় মমি চেম্বারে (বিশেষ ব্যবস্থায় মমি করা) ছাড়াই সংরক্ষিত আছে। দেহের ভিতরের কোন অঙ্গও অপসারণ করা হয়নি। মিশরের অন্যান্য মমিগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় মমি করার পরেও রামসিসের মমির মতো এত ভালভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। যদিও দেহটি প্রায় ৩০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাগরে ছিল তবুও সাগরের মাছ দেহটির কোনও ক্ষতি করেনি।

এতদিন সাগরে দেহ থাকলে খুব সহজেই তা মাছের খেয়ে ফেলার কথা কিন্তু তারা তা করেনি। ফেরাউন ছিল মিশরের বিখ্যাত ও নিষ্ঠুর রাজা। সে নিজেকে সৃষ্টিকর্তা বলে দাবি করেছিল। যারা তার পূজা করত না তাদেরকে সে নানাভাবে অত্যাচার করতো। এসকল মানুষকে নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচানো এবং সঠিক পথে আনার জন্য আল্লাহ পাক নবী হযরত মুসা (আঃ)কে পাঠিয়েছিলেন। ফেরাউন রামসিস ও তার অনুসারীরা ভেবেছিলো যে মিশরের ঐতিহ্যগত ধর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা মুসা নবীর উদ্দেশ্য।

ঐতিহ্যগত ধর্ম নানাভাবে ফেরাউনকে সুবিধা দিয়ে আসছিলো। তাই ফেরাউন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে অস্বীকার করে। ফলস্বরূপ আল্লাহ্‌ পাক তার অনুসারীদের উপর নানা দুর্যোগ প্রদান করেন। তা সত্ত্বেও ফেরাউন নিজেকেই স্রষ্টা বলে দাবি করেছিলো। তাই আল্লাহ্‌ লোহিত সাগরে ডুবিয়ে ফেরাউনের মৃত্যু ঘটিয়েছিলেন এবং তা প্রায় ৩০০০ বছর ধরে দেহটি সংরক্ষণ করে আসছেন। এরকম ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বলেন- ফেরাউন ডুবে মারা গেছে আর মৃত্যুর পরও তার শরীর অক্ষত রাখা হবে, পরবর্তী সীমালংঘনকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে।

কুরআনের ভাষায়:

وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ – آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ – فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَة-

অর্থাৎ, আর আমি বনী ইসরাইলদেরকে সমুদ্র পার করে দিলাম। অতঃপর ফেরাউন ও তার দলবল বাড়াবাড়ি ও শত্রুতাবশতঃ তাদের পিছু নিল। অতঃপর যখন সে ডুবতে শুরু করল সে বলল: বনী ইসরাইলগণ যে সত্ত্বার উপর ঈমান এনেছে আমিও সেই সত্ত্বার উপর ঈমান আনলাম যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, আর আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। এখন(এমন কথা বলছ)! এর আগে তুমি আমার নাফরমানী করেছ এবং তুমি ছিলে ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি কারীদের অন্তর্ভুক্ত। আজ আমি তোমার দেহকে উদ্ধার করব(বাচিয়ে দেব) যেন তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্যে নিদর্শন হয়ে থাক। (সুরা ইউনুস: ৯০-৯২ আয়াত)

এখন তো আমি কেবল তোমার লাশটাকেই রক্ষা করবো যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য শিক্ষণীয় নিদর্শন হয়ে থাকতে পারো । যদিও এমন অনেক মানুষ আছে যারা আমার নিদর্শন সমূহ থেকে উদাসীন। ( সুরা ইউনুসঃ আয়াত – ৯২ )

আল্লাহ অন্য এক জায়গায় ফেরাউনের এই ভীতিকর অবস্থার সংবাদ জানিয়ে বলেছেনঃ “এটি একটি পয়গাম সব মানুষের জন্যে এবং এটি পাঠানো হয়েছে এ জন্য যাতে এর মাধ্যমে তাদেরকে সতর্ক করা যায় এবং তারা জেনে নিতে পারে যে, আল্লাহ একমাত্র তিনিই আর যারা বুদ্ধিমান তারা যেনো চিন্তা ভাবনা করে” ( সুরা ইব্রাহীমঃ আয়াত-৫২ )।


আরও পড়ুন