অর্থনীতি - মে ২, ২০১৯

বিদেশে মুনাফা স্থানান্তর : বিএটিবি’র চাতুরীতে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ

২০১৬ সালে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) রয়্যালটি, কারিগরি ও পরামর্শক ফি এবং আইটি সার্ভিস বাবদ যে মোটা অঙ্কের টাকা যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর করেছে তার ফলে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার কর রাজস্ব হারিয়েছে। কোম্পানিটির চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের কারণে ২০৩০ সালের নাগাদ বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, গায়ানা, ব্রাজিল এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো একত্রে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার কর রাজস্ব হারাবে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক কর্তৃক নিম্ন ও মাঝারি আয়ের দেশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় বিএটির কর এড়ানোর এসব কৌশল উদ্ঘাটিত হয়েছে।

‘অ্যাশেস টু অ্যাশেস’ শিরোনামে ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হলেও দেশের অর্থনীতিতে তার ক্ষতিকর প্রভাব অনেক বেশি। উদাহরণ স্বরূপ, ২০১৬ সালে বিএটি বাংলাদেশ ৭.৬ বিলিয়ন টাকা নিট মুনাফা করে, একইসময়ে ধূমপানের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫৮ বিলিয়ন টাকা। বর্তমানে বিএটিবির ৭২.৯ শতাংশ মালিকানা যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো গ্রুপের হাতে। বিশ্বের ১৮০টি দেশে তামাক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া বিএটির দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ বাজার বাংলাদেশ। ভ্যাট এবং আবগারি শুল্ক (যা প্রকৃতপক্ষে কোম্পানি নয়, বরং ব্যবহারকারী পরিশোধ করে) মিলিয়ে যে অর্থ বিএটিবি রাজস্ব বাবদ প্রদান করে, তার ভিত্তিতে নিজেদেরকে ‘বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ করদাতা’ হিসেবে প্রচার করে কোম্পানিটি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শুধু ২০১৬ সালেই বিএটি বিভিন্ন দেশে অবস্থিত কোম্পানিগুলো থেকে প্রাপ্ত মোট কর-পূর্ব মুনাফার ১২.৩ শতাংশ অর্থাৎ ৯৪১ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাজ্যে অবস্থিত তাদের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বিএটি হোল্ডিংসে স্থানান্তর করেছে এবং এজন্য বিএটিকে প্রায় কোন প্রকার করই দিতে হয়নি। কোম্পানিটির ১৯টি ট্যাক্স হেভেনে শতাধিক অফশোর সাবসিডিয়ারি রয়েছে, যার একটি মাত্র ঘটনা এটি।

বাংলাদেশে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে বিএটিবির হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোম্পানিটি রয়্যালটি বাবদ যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (হোল্ডিং) লিমিটেডকে বছরে ৫ মিলিয়ন ডলার, কারিগরি ও পরামর্শক ফি হিসেবে বিএটি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে ১০-১২ মিলিয়ন ডলার এবং আইটি সার্ভিস ফি বাবদ বিএএসএস জিএসডি লিমিটেডকে বছরে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। এই তিন খাত মিলিয়ে বিএটি বাংলাদেশ শাখা থেকে বছরে প্রায় ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে বিএটির মালিকানাতেই থাকা বিভিন্ন কোম্পানির কাছে পাঠানো হয়েছে, যা তাদের ওই বছরের কর-পূর্ব মুনাফার প্রায় ১৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে, বিএটিবি তাদের মুনাফার ওপর বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ হারে কর্পোরেট কর প্রদান না করে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় অত্যন্ত স্বল্পহারে (১০ থেকে ২০ শতাংশ) কর পরিশোধ করেছে। এতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার কর রাজস্ব হারিয়েছে, যা দিয়ে দেশের ২ লক্ষ মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বহন করা সম্ভব। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিএটিবির বিরুদ্ধে কর সংক্রান্ত অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ১,৯২৪ কোটি টাকা কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫.৩ শতাংশ (৩ কোটি ৭৮ লক্ষ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। এরমধ্যে সিগারেট ধূমপায়ীর সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লক্ষ এবং গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০৯ সালের তুলনায় ১৫ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লক্ষ ৬১ হাজার মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত অসুখে মৃত্যুবরণ করে।

প্রতিবেদনে তামাক কোম্পানিগুলো যেনো কর ফাঁকি বা কর এড়িয়ে যেতে না পারে, সেজন্য আরো বড় পরিসরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদেয় কর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যত বেশি জনগণের হাতে আসবে, কোম্পানিগুলো তত বেশি দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করতে বাধ্য হবে। তামাক কোম্পানির মুনাফার হিসাব প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে, কারণ সরকার কর্তৃক তামাক কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ডে নজরদারির কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও তামাক কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব এবং তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য খাতে সরকারের ব্যয়ের তুলনামূলক হিসেব সরকারের করা প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি


আরও পড়ুন