ফিচার - মে ৩, ২০১৯

মিশরে মৃত্যুর শহর (Dead city)!

মিশরের রাজধানী কায়রোতে রয়েছে ৭বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিশাল এক উপ-শহর যার নাম ডেড সিটি বা মৃত্যুর শহর। হাজার হাজার বছরের পুরানো এই শহরটিতে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত অমর ইবনুল আস (রাঃ), সাঈদা জয়নব (রাঃ) সাঈদা নাফিসা (রঃ), সাঈদা আইশা (রাঃ), ইমাম শাফী (রাঃ) হযরত জালাল উদ্দিন সিউদী (তাফসীরে জালালাঈন) (রঃ), মোহাম্মদ আলী পাশা, মিশরের শেষ রাজা কিং ফারুকসহ অগণিত নাম না জানা সাহাবী ও ইসলামের বিভিন্ন সৈনিকরা।

কিছুদিন আগে আমার এক সহকর্মীর মৃত্যুর পর আমি গিয়েছিলাম দাফন করতে এই মৃত্যুপুরীতে। জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদেই জানাজার পর কফিন বাহির করার সাথে সাথে নিজে থেকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা বিভিন্ন বাস, মাইক্রোবাস গাড়ির ড্রাইভার ও মালিকরা। ওঠাতে থাকে কফিনের সাথে যাওয়া নারী পুরুষদের। গাড়িতে উঠার সাথে সাথেই সবাইকে এগিয়ে দেওয়া হয় শীতল পানি। কি অদ্ভুত এক ভ্রাত্তিত।

আমি আমার অনান্য সহকর্মীদের নিয়ে দুতাবাসের অফিসিয়াল গাড়িতেই কফিনের পিছনে গেলাম সমাধিস্থলে। উঁচু প্রাচীরের ভিতরে দুই রুমের ছোট্ট একটি বাড়ি। বাড়ির ভিতরে কফিনটি এক পাশে রেখে মেঝে থেকে সরানো হল দুইটি পাটাতন। কয়েক ধাপ সিড়ির পর গোহাকারে একটি রুম। রুমটির মাঝখানে দেওয়াল দিয়ে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি পুরুষদের অন্যটি নারীদের।

অর্থাৎ, ছেলে, বাবা, দাদা, বড় বাবা……. অন্য টিতে বউ, শাশুড়ি, দাদী শাশুড়ি বড় দাদী শাশুড়ি …… এই পরিবারের শত শত বা হাজার বছর ধরে মৃত সদস্যরা চির শায়িত আছেন।

পাটাতন সরানোর পর একজন ঢুকে গেলেন পুরুষদের গুহার ভিতর। ভিতরের থাকা পুরানো কফিনের হাড় গুলো এক পাশে সরিয়ে নতুন কফিনটি দিতে বললেন। চার জনে কফিনটি নামিয়ে দুজনে ধাক্কা দিলেন ভিতরে। ভিতরে থাকা বেক্তি কফিন টি টেনে কেবলা মুখি অবস্থান নিশ্চিত করে বেরিয়ে এলেন গোহা থেকে। পাটাতন গুলো আবার বসিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় গুহা ও সিড়ির মুখ। দোয়া করে আমরা সবাই চলে এলাম। থেকে গেল মৃত বেক্তির অতি আপনজন। তিন দিন থাকবেন ঐ কবরস্থানের বাড়িটিতে। সময় খাটাবেন পবিত্র কোরআন পাঠ ও মৃত বেক্তির জন্য দোয়া করে। আবার প্রতি বছর মৃত বেক্তির জন্ম দিন, মৃত্যু বার্ষিকী, রমজান, ঈদ আসলেই চলে যাবেন ডেড সিটির সেই বাড়িটিতে। এবাদত আর দোয়া করে সারাদিন সংগ দিবেন তাদের মৃত আপনজনকে।

আপনি যদি কখনও মিশরে বেড়াতে আসেন তাহলে দেখবেন, বিভিন্ন হাসপাতালের গেইটে, মসজিদের পাশে, কিংবা বাজারের কোন এক কোনায় কাল কাপর বা বোরখা পরিহিত বয়স্ক কিছু মহিলা জটলা বেধে বসে আছেন। হয়ত আপনার বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, এরা শোক বা মাতম পার্টি। অর্থাৎ কেহ মারা গেলে ওরা টাকার বিনিময়ে শোক মাতম করে। টাকা দিলেই এই মহিলারা মৃত বেক্তির বাড়ির সামনে বা জানাজার নামাজের আগে পরে মসজিদের বাহিরে তাদের নিজেদের দুই গালে, বুকে ও মাথায় চাপরাতে থাকে আর বলে, এয়া লা হুই, হাবিবী আলবী, হাবিবতী আলবী এয়া আখুইয়া বলে।

মৃত বেক্তির দাফনের পর মাগরিবের পর থেকে মধ্যে রাত পর্যন্ত পরিবারকে সমবেদনা ( عزاء, Condolence) জানাতে আসেন আত্মীয় সজন, বন্ধু বান্ধব ও সহকর্মী রা। মৃত বেক্তির বাসার সামনে বিশাল আকারে সামিয়ানা টানিয়ে ভিতরে প্রচুর লাইট ও দুই পাশে চেয়ার রাখা হয়।

সামিয়ানার প্রবেশ পথে মৃত বেক্তির পরিবারের সদস্যরা দারিয়ে আগত অতিথিদের স্বাগত জানান। সামিয়ানার শেষ প্রান্তে আরবীয়ান চেয়ারে বসে আয়েসি ভংগিতে পবিত্র কোরআন শরিফে তেলাওয়ত করেন কোন এক বিশিষ্ট শাইখ। আর সাথে সাথে অতিথিরা আল্লাহ আল্লাহ বলে ধ্বনি দেন। অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করা হয় চিনি বিহীন কাল কফি (Black Coffee without Sugar) দিয়ে। মহিলাদের জন্য করা হয় বাড়ির ভিতরে কিংবা আলাদা স্থানে। অনেক সময় কোন কোন পরিবার প্রতিসহযোগিতায় নামে বড় সামিয়ানা টানানো, সবচেয়ে জন প্রিয় শাঈখকে দিয়ে কোরান তেলাওয়াত করানো কিংবা শোক অনুষ্ঠানে কত বেশি লোক হল নিয়ে। আর এই শোক অনুষ্ঠান (عزاء) চলে তিন দিন।


আরও পড়ুন