সোমেশ্বরী ও সুসং দুর্গাপুরকে কে বাঁচাবে?

গ্রামে একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে বাঙালিদের নিয়ে।যারা বয়সে মুরুব্বি তাদের কাছ থেকে শোনা কথা হলো,-‘বাঙালিরা নাকি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দেয় না’।আরও বলে!আমরা নাকি দাঁত হারাইয়া তারপর হা-হুতাশ করি।এইটা নাকি আমাদের সহজাত স্বভাব।আবার এই কথার সত্যতার প্রমাণও পাই অহরহ।ধরা যাক রাষ্ট্রের কথাই।একটা বড়সড় ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনা না ঘটলে রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিদেরই টনক নড়ে না। হোক না তা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সর্বনাশা মাদক,সড়কে নানান অনিয়ম,অগ্নিকান্ড,বন্যা,ভূমিকম্প সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্নিতী।এসবের কোন কিছু যখন বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তখনই আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠি।আমরা সরব হই।প্রতিকার না পেলেও আমরা ঘুমিয়ে যাই।আবার যখন বিপত্তি ঘটে আবারও জেগে উঠার ভান।এই স্বভাবেই চলেছি,চলছি,হয়তোবা চলবোও!অথচ এসব থেকে উত্তরণের পরিকল্পনাগুলোর যদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যেত তাহলেই আসতো সুদিন।বাংলাদেশ হয়ে উঠতো সোনার বাংলা।স্বাধীনতার চেতনায় অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে যারা এই দেশের জন্য,আমাদের জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে তাঁদের বিদেহী আত্মা শান্তি পেত।শান্তি পেত ১৯৭৫ সালে স্বপরিবারে নিহত স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতার আত্মা।বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে আমাদের দেশের উন্নয়ন,অগ্রগতি স্থবির হয়ে যায়।সেই স্থবিরতা কাটে ২১ বছর পর তাঁর সুকন্যা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ায়।আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারি ৯ম সংসদ নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনার জয়ী হওয়ায়।বঙ্গবন্ধু কন্যার বলিষ্ট নেতৃত্বে বহু পথ পেড়িয়ে আজ আমাদের দেশ একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।আজ নানান অসঙ্গতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।দেশ কে তিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করছেন।দেশের ভবিষৎ এর কথা চিন্তা করে তিনি শত বছরের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে,-একটি ছোট মফস্বল শহর,শহরের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া নদী ও বসবাসকারী সাধারণ নাগরিকগণ তাদের স্বাভাবিক জীবন পাবে এই প্রত্যাশা রাখছি।মফস্বল শহরটির নাম দুর্গাপুর।নামটা শুনলেই কেউ কেউ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,-‘সুসং দুর্গাপুর’! নেত্রকোনা জেলার সুসং দুর্গাপুর পর্যটন এলাকা হিসেবে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম।দুর্গাপুর অন্য পরিচয়েও হতে পারতো পরিচিত।বিভিন্ন জার্নাল থেকে জানা যায় জিএসবি ১৯৮৯ সালের এক সার্ভের মাধ্যমে গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশের সোমেশ্বরী নদীতে ইউরেনিয়াম এর অস্তিত্ব পায়।পরবর্তীতে অদৃশ্য কারণে তা আর জনসন্মুখে আলো পায় নি।দুর্গাপুর ভারতের মেঘালয় সীমান্তে অবস্থিত।ইন্ডিয়ান জিও সার্ভে থেকে জানা যায় সীমসাং(সোমেশ্বরী) নদীর অববাহিকায় উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম,চুনাপাথর,সিলাকা বালি বিদ্যমান।যা মেঘালয়ের বালপাকরাম ন্যাশনাল রিজার্ভ ফরেস্ট ও এর আশপাশে অবস্থিত।সার্ভে মতে ১ টন বালু থেকে ১ গ্রামের মত ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা যেতে পারে।তাহলে গণপ্রজানন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার যদি সঠিক পরিচালনায় এই বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে সকলেরই মঙ্গল।রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে যা কাজে লাগতে পারে।বিদেশে রপ্তানি করেও আয় করতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা।সর্বোপরি সুসঙ্গ দুর্গাপুর কে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে।সাম্প্রতিক সময়ে আদালত নদীকে জীবন্ত স্বত্বা হিসেবে উল্লেখ করেছে।জীবন্ত সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ নীল জল, তার সৌন্দর্য ও সম্পদ বাঁচাতে কেউ কি এগিয়ে আসবে?

১৮৯৭ খ্রি. ১২ই জুন বিকাল ৫;১০ এর ৮ মাত্রার গ্রেট আসাম ভূমিকম্পতে এই অঞ্চলের মারাত্মক ক্ষতি হয়।রাজপ্রাসাদ সহ নানা স্থাপনা ভেঙ্গে পড়ে।তারপর থেকে এই অঞ্চলের রাজাগণ সিদ্ধান্ত নেন কাঠের প্রাসাদ নির্মাণের।তাই অন্যান্য অঞ্চলের মত বড় ইমারতের রাজপ্রাসাদ এখানে চোখে পড়েনা।জনশ্রুতি আছে বৃটিশগণও এই অঞ্চলে ভারী স্থাপনা করতে অনুমতি দিতেন না।ভু-তাত্বিক গবেষকদের মতে ১০০ থেকে ১৩০ বছরের মাঝে ভুকম্পন আবার একই বা বেশি মাত্রায় আবার হয়।সেদিক দিয়েও দুর্গাপুর আছে ভয়ানক এক জায়গায়।আসামের সেই কেন্দ্রস্থল খুব বেশি দূরে নয়।অনেকে জানতে চায় দুর্গাপুরের সোমেশ্বরীর মহাশূল কি পাওয়া যায়?কি বলবো যা আজ ইতিহাস!সোমেশ্বরী নিজেইতো আজ অসহায়।তার বুকে মহাশূল বা অন্যান্য প্রাণীকূল বাঁচবে কিভাবে!সোমেশ্বরী নদীকে বালুমহাল হিসেবে ঘোষণা করেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।প্রতিবছর সামান্য টাকার কাছে ইজারা দেয় বৈধ ক্ষমতাবান ইজারাদারদের কাছে।নিয়মমাফিক ইজারা দিয়েই প্রশাসন এর কাজ শেষ হয়ে যায়।ইজারাদারই ১ বছরের জন্য হয়ে উঠেন আইন।বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ তাদের কাছে শুধু কাগজের বাঘ।আইনে যা বলা আছে তার কোন কিছুই সঠিকভাবে অনুসরণ করে না ইজারাদার।বালুমহালের পরিস্থিতি সঠিকভাবে নিয়মিত তদারকিও করে না দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসন।টাকা ও ক্ষমতার কাছে সবাই যেন জিম্মি।এই ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ নাগরিকের স্বাভাবিক জীবন ও প্রকৃতি আজ তাই অসহায়।দুর্গাপুর আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতে বালু উত্তোলনে মানা হয় না কোন নিয়ম।নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক কর্তৃক ইজারাকৃত বালুমহাল এর ৭ টির মাঝে ৫টি দুর্গাপুর ।আইনে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন নিষেধ করা আছে।আর যদি তলদেশ থেকে উত্তোলন করাও হয় তাহলে সুইং করার কথা বলা আছে।আইনে আছে প্রচলিত বাল্কহেড ড্রেজার নিষিদ্ধ।কে মানে!?

সরেজমিনে বালুমহাল ঘুরে দেখা যায়, পাম্প মেশিন দিয়ে তৈরি করা ড্রেজারে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি।নদীর গর্ভ থেকে মোটা পাইপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্ত বালি আহরণ করা হয়।বালির সাথে ভূ-গর্ভ থেকে উঠে আসে নুড়িপাথর সহ নানান খনিজ সম্পদ।মাঝনদীতেই স্তুপ করে রাখা হয় বালি-পাথর।যার ফলে দেখা যায় কোথাও উঁচু কোথাও নিঁচু।

জানাযায়, এই সব উঁচু-নিঁচু গর্তে পড়ে প্রাণগেছে বেশ কয়েকজনের।এই সব মেশিন থেকে নির্গত পোড়া তেল ক্ষতি করছে নদীর জীবকূলের।মেশিনগুলোর কালো ধোঁয়া ডেকে আনছে পরিবেশের বিপর্যয়।প্রায় ৩০০ মেশিনের শব্দে কম্পমান চারপাশ।এমনও দেখা গেছে নদীর মাঝখানে বাঁধ দিয়ে স্বাভাবিক গতিপথও বদলে দেওয়া হয়েছে।পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের শহর রক্ষা বাঁধ স্থানে স্থানে ধসে পড়ছে।তবুও সবই যেন স্বাভাবিক!দিনরাত এই বালু-পাথর নিয়ে যেতে আসছে প্রায় ১০০০ ট্রাক/লরি(কম-বেশি)।ছোট শহরের মানুষের রাতের ঘুম দিনের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এসব যান।বালু বোঝাই ট্রাকগুলো থেকে নির্গত পানি পৌরশহরের রাস্তা ও আঞ্চলিক মহাসড়ক নষ্ট করছে।ঝুকিতে ফেলেছে বিরিশিরি,আত্রাখলি সেতু সহ ছোট-বড় সেতুগুলোকে।২০১২ সালের সড়ক ও জনপথের ৯০ কোটি টাকার রাস্তা ২ বছরও টিকে নাই।২০১২ সাল থেকে সরকার এই বালুমহাল থেকে হয়তো সর্বোচ্চ রাজস্ব পেয়েছে ৬০/৭০ কোটি ।৩১৬ কোটি টাকা নতুন বরাদ্দে আবার শুরু হওয়া রাস্তা এই পরিস্থিতিতে কতদিন টিকবে তা প্রশ্নবিদ্ধ।এখানেও সরকারের লাভের চাইতে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে।

পর্যটন এলাকা হিসেবে যে গৌরব ছিলো তাও আজ হারাতে বসেছে দুর্গাপুর।প্রকৃতির সানিধ্য পেতে আসা পর্যটকগণ রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘন্টা জ্যামে আটকে থাকে।পাখির কলকাকুলির বদলে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছেও পান ড্রেজার এর বিকট শব্দ,ট্রাকের হর্ন।পৌরশহরের অলি-গলির রাস্তায় ট্রাকের দৌড়াত্নে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বেকদায়।দুঃশ্চিন্তায় থাকে অভিবাবকগণ।পৌরশহরের মাঝদিয়ে প্রবাহমাণ সোমেশ্বরী নদী থেকে দু-পাড় ঘর-বাড়ি,দোকানপাঠ,মন্দির-মসজিদ সবই আজ ঝুঁকিতে।কে বাঁচাবে নদী ও নগর কিংবা নতুন পরিচয় দিবে!?


আরও পড়ুন