বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের শোলাকিয়া

উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে এবারও অনুষ্ঠিত হবে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাত।

স্থানীয় সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার দেওয়ান মান্নান দাদ খান শোলাকিয়ার এ জমি দান করেন। তার দানকৃত জমি ১৯৫০ সালে ওয়াকফ হয়। সে ওয়াকফনামায় ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে বলে লেখা রয়েছে। সে হিসেবে মাঠের বর্তমান বয়স ২৬৯ বছর।

এছাড়া ১৮২৮ সাল থেকে জঙ্গলবাড়ীর জমিদার এ মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকে বড় জামাত শুরু হয়। সে হিসেবে অনুযায়ী এবার শোলাকিয়া ঈদগাহে ঈদুল ফিতরের ১৯২তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার ৭৮ বছর পর ১৮২৮ সালে প্রথম বড় জামাতে এই মাঠে একসঙ্গে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়ালাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন। স্থানীয় হয়বতনগর সাহেব বাড়ির উর্দ্ধতন পুরুষ শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ (র:) সে জামাতে ইমামতি করেন।

ঐতিহ্যবাহী এ মাঠে খ্যতিসম্পন্ন আলেমগণ ইমামতি করেছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রথম বড় জামাতের পর আরো যারা ইমামতি করেছেন, তারা হলেন- হযরত মাওলানা হাফেজ মুহম্মদ হযরত উল্লাহ, হযরত মাওলানা পেশওয়ারী, হযরত মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন, আলহাজ্ব মাওলানা হামিদুল হক, হযরত মাওলানা মাজহারুল হক, হযরত মাওলানা আবদুল গনি, হযরত মাওলানা আতহার আলী, হযরত মাওলানা আবদুল মান্নান, হযরত মাওলানা আবুল খায়ের মুহাম্মদ নূরুল্লাহ ও মাওলানা আবুল খায়ের মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।

২০০৯ সাল থেকে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ ঈদ জামাতে ইমামতি করছেন। তবে ২০১৬ সালে ঈদ জামাত শুরুর আগে জঙ্গি হানার ঘটনার পরিস্থিতিতে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ পরিবর্তে জামাতে ইমামতি করেন বিকল্প ইমাম শহরের বড়বাজার জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা শোয়াইব আব্দুর রউফ। তবে গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ ওলামা-মাশায়েখ সংহতি পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদের ইমামতিতেই জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এবারও তিনি জামাতে ইমামতি করবেন।

ঈদগাহের নামকরণ: শোলাকিয়া কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একটি বৃহৎ ও পুরাতন জনবসতি এলাকা। বর্তমান শোলাকিয়া নামক স্থানটির পূর্বনাম ছিল রাজাবাড়ীয়া। কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব উত্তরকোণে নরসুন্দা নদীর অববাহিকায় শোলাকিয়া এলাকার অবস্থান। জনশ্রুতি রয়েছে, শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রথম বড় জামায়াতে সোয়ালাখ মুসুল্লি অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্য মতে, মোঘল আমলে এখানে অবস্থিত পরগণার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়ালাখ টাকা। কালের বিবর্তনে সোয়ালাখ থেকে সোয়ালাখিয়া এবং সেখান থেকে বর্তমান শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি।

মাঠের জমির পরিমাণ: কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে মসনদ-ঈ-আলা ঈশাখাঁর ৬ষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খানের উত্তরসুরী দেওয়ান মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে ৪.৩৫ একর ভূমি শোলাকিয়া ঈদগাহকে ওয়াকফ করে দেন। এ মাঠের বর্তমান জমির পরিমাণ ৬.৬১ একর। অবশ্য অজু করার পুকুর, মাঠ মিলিয়ে সর্বমোট পরিমাণ প্রায় ৭ একর। মাঠে প্রবেশের মূল সড়কে একটি তোরণ ও একটি দোতলা মিম্বর রয়েছে।

ঈদগাহ পরিচালনা: ১৯৫০ সাল থেকে ওয়াকফের দলিল মূলে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খান থেকে বংশানুক্রমিক জৈষ্ঠ্য পুত্রগণ শোলাকিয়া ঈদগাহের মোতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে দেওয়ান ফাত্তাহ দাদ খান মঈন মোতাওয়াল্লি ও দেওয়ান মো. রউফ দাদ খান নায়েবে মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি মাঠ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।

ঈদগাহের মুসুল্লি: ২৬৫টি কাতার সম্বলিত শোলাকিয়া ঈদগাহে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসুল্লির সমাবেশ ঘটে। ঈদের নামাজ মাঠে পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদা এবং যে জামায়াতে মুসুল্লি যতবেশি হয় ছওয়াবও তত বেশি হয়, গোনাহ মাফ হয়। এ বিশ্বাস থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিশাল জামাতে নামাজ পড়তে আসেন।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের এ বিশাল জামাতে কিশোরগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মুসুল্লির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মুসলমান নামাজে অংশগ্রহণ করেন। জামাত শুরুর মুহূর্তে মাঠের অনুচ্চ প্রাচীরের বাইরের সড়ক, নদীর পাড় এবং আশপাশ এলাকায় মুসুল্লিদের কাতার ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অংশ নেয়া মুসুল্লির সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ছাড়িয়ে যায়।

যেভাবে আসবেন ঈদগাহ ময়দানে: ঈদুল ফিতরের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামায়াতে অংশগ্রহণ ইচ্ছুক মুসুল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ২টি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে।

ভৈরব-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) ভৈরব থেকে ছেড়ে আসে সকাল ৬টায়, কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। কিশোরগঞ্জ-ভৈরব (স্পেশাল) কিশোরগঞ্জ থেকে দুপুর ১২টায় ছেড়ে যাবে, ভৈরব পৌঁছাবে দুপুর ২টায়।

এছাড়া ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ (স্পেশাল) ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসে সকাল ৫.৪৫ মিনিটে, কিশোরগঞ্জ পৌঁছে সকাল ৮.৩০ মিনিট। কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ (স্পেশাল) কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাবে দুপুর ১২টায়, ময়মনসিংহে পৌঁছে বিকেল ৩টায়।

ঢাকা থেকে সকালে এবং সন্ধ্যায় এগারসিন্দুর ও কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনে কিশোরগঞ্জ পৌঁছে মাত্র ১০/১৫ টাকার রিকশা ভাড়ায় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে পৌঁছা যায়। এছাড়া বিভিন্ন বাস সার্ভিসে সায়েদাবাদ, কমলাপুর গোলাপবাগ ও মহাখালী থেকে কিশোরগঞ্জ আসা যায়। এছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে মুসুল্লিরা রিজার্ভ বাস নিয়ে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে আসেন।


আরও পড়ুন