ফিচার - মে ৩১, ২০১৯

মিশরে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এর সমাধি ও মসজিদ!

মিশরের রাজধানী কায়রোর মৃত শহর (ডেড সিটি)তে রয়েছে শাফেয়ী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হযরত আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস আল-শাফেয়ী (রহঃ) أبو عبد الله محمد ابن إدريس الشافعي র সমাধি ও মসজিদ। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন একজন যুগ শ্রেষ্ট ইসলামি ফকিহ্, গবেষক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আলেম।

মহাবিশ্বে যে সকল মহামনীষী ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করে, ইসলাম কে অনুসরণের জন্য সাধারনের নিকট সহজ সাধ্য করে তুলেছেন তাদের মধ্য তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি তার গোটা জীবন কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর নিখান ও নির্জাস বের করে, উম্মতে মুহাম্মদীদের নিকট পৌছে দিতে উৎসর্গ করেছেন। কুরআন ও হাদিসের গবেষণা যাকে আমরা ইজতিহাদ বলে থাকি, এ ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার সহিহ ও সঠিক গবেষণা এতই খ্যাতি অর্জন করে যে তাকে সমকালীন যুগে ফকীহদের সর্দার বলা হতো।

ইমাম শাফেঈ (রহ:) এর পুরো নাম মোহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস ইবনে আব্বাস ইবনে উসমান ইবনে শাফেঈ, আল কুরাশী, আল শাফেয়ী, আল মাক্কী। এ হিসাবে তার নাম-মুহাম্মদ, পিতার নাম-ইদ্রিস, দাদার নাম-আববাস। তার উপনাম আবূ আব্দুল্লাহ্। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে তাঁর নবম পূর্বপুরুষ আবদুল মান্নাফ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এর চতুর্থ পূর্বপুরুষ ছিলেন। ইমাম সাহেবের ৫ম প্রপিতামহ সায়িব বদরের যুদ্ধে শত্রু পক্ষে অবস্থান করলেও পরবর্তীকালে তিনি ও তাঁর ছেলে শাফেয়ী সাহাবী হবার মর্যাদা লাভ করেন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এর বংশ- কুরাইশ বংশের অন্যতম ‘‘আব্দে মান্নাফ বিন কুসাই’’ এর কাছে মিলিত হয়েছে, তাই ইমাম শাফেয়ীর বংশের মূল এবং রাসূল (ছাঃ) এর বংশ একই। এ জন্য তিনি আল-মুত্তালাবী বলে পরিচিত, তিনি কুরাইশ বংশের তাই কুরাশী এবং তাঁর দাদা ‘‘শাফে’’ সাহাবী এর দিকে সম্পৃক্ত করায় শাফেয়ী, মক্কায় প্রতিপালিত হওয়ায় মাক্কী বলে পরিচিতি লাভ করেন। হযরত ইমাম শাফেয়ী (রাহঃ) ১৫০ হিজরিতে তথকালিন আসকালান কারো মতে গাজায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর মাতা ছিলেন ইমাম হাসান (রা)এর বংশধর। তার মাতা বংশ পর্ষ্পরা ছিলেন, উম্মুল হাসান বিনতে হামযা ইবনে কাসেম ইবনে ইয়াযীদ ইবনে হাসান (রা:)। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর উপাধি হল, ‘‘নাসিরুল হাদীস’’ হাদীসের সাহায্যকারী বা সহায়ক, কারণ হাদীস সংগ্রহ, সংকলন, বিশেষ করে হাদীসের যাচাই-বাছাইয়ে তিনি সর্ব প্রথম অবদান রাখেন, তিনিই সর্ব প্রথম হাদীস শাস্ত্রের নীতিমালা প্রণয়নে কলম ধরেন ‘‘আর রিসালাহ ও আল উম্ম’’ গ্রন্থদ্বয়ে।

অতঃপর সে পথ ধরেই পরবর্তী ইমামগণ অগ্রসর হন। ছোট কালেই পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যান, পিতার মৃত্যুর পর অভিভাবকহীনতা ও দারিদ্রতা ইত্যাদি নানা সমস্যার সম্মুখীন হন, পিতা মারা গেলে বিচক্ষণ মা তাকে দু’বছর বয়সে মক্কায় নিয়ে আসলে তিনি কুরআন মুখস্ত করায় মনোনিবেশ হন এবং সাত বছর বয়সেই সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্ত করেন। মাত্র দশ বছর বয়সে মুয়াত্তা হাদীস গ্রন্থ হিফজ করে পনের বা আটার বছর বয়সে ফাতাওয়া প্রদান শুরু করেন। সাথে সাথে মক্কায় আরবী পন্ডিতদের কাছে আরবী কবিতা ও ভাষা জ্ঞানে পূর্ণ পান্ডিত্ব লাভ করেন।

ইমাম শাফেয়ী (রাহঃ) ইয়েমেন ও ইরাক হয়ে মিশরে আগমন করলে মিশরবাসী সানন্দে স্বাগত জানান, তথকালিন মিশরের বড় মসজিদ – আমর বিন আল আস মসজিদে কিছু আলোচনা পেশ করলে সকলেই তাঁর আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে যান, এবং তারা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, মিশরের বুকে এমন প্রতিভাবান ব্যক্তির কখনও আগমন ঘটেনি, যিনি কুরাইশ বংশোদ্ভুত, যার সালাতের ন্যায় উত্তম সালাত আদায় করতে কাউকে দেখিনি, যার চেহারার ন্যায় সুন্দর চেহারা খুব কমই আছে, যার বক্তব্য ও বাচন ভঙ্গির মত আকর্ষণীয় ও শ্রুতিমধূর কাউকে দেখিনি । তাঁর হাদীস গবেষণা ও চর্চায় যারা হানাফী বা মালিকী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, তার অনেকেই হাদীসের আলোকে ইসলাম চর্চার সুযোগ লাভে ধন্য হন। ইমাম শাফেয়ী জীবনের শেষ পর্যন্ত মিশরেই অবস্থান করেন এবং তাঁর মূল্যবান গ্রন্থসমূহ এখানেই সংকলন করেন।

ইমাম শাফেয়ী অসংখ্য গ্রন্থ রেখে গেছেন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমন- (১) ‘‘কিতাবুল উম্ম’’ মূলতঃ এটি একটি হাদীসের গ্রন্থ, যা ফিকহী পদ্ধতিতে স্বীয় সনদসহ সংকলন করেছেন, এটি একটি বিশাল গ্রন্থ। যাহা ৯টি বড় ভোলিয়মে প্রকাশিত। (২) ‘‘আর রিসালাহ’’ এটা সেই গ্রন্থ যাতে ইমাম শাফেয়ী উসূলে হাদীস ও উসূলে ফিকহে সর্বপ্রথম কলম ধরেছেন। (৩) ‘‘আহকামুল কুরআন’’। (৪) ‘‘ইখতিলাফুল হাদীস’’। (৫) ‘‘সিফাতুল আমরি ওয়ান্নাহী’’। (৬) ‘‘জিমাউল ইলম’’। (৭) ‘‘বায়ানুল ফারয’’। (৮) ‘‘ফাযাইলু কুরাইশ’’। (৯) ‘‘ইখতিলাফুল ইরাকিঈন’’। (১০) ইখতিলাফু মালিক ওয়া শাফিয়ী।

ইমাম শাফেয়ীও (রহ.) আল্লাহর নিয়মের বাইরে নন, একই নিয়মে তিনিও এসেছেন আবার সব কিছু রেখে আল্লাহর আহবানে সারা দিয়ে ২০৪ হিজরীর রজব মাসের শেষ দিন জুমআর রাত্রিতে পৃথিবী হতে বিদায় গ্রহণ করেন। মৃত্যুর পর তাকে কায়রোর মৃত্যুর শহর এলাকাতেই সমাধিস্থ করা হয়। ইমাম শাফেয়ীও (রহ.) সমাধির পাশেই রয়েছে বিশাল এক মসজিদ ও মাদ্রাসা। বেশ কয়েক বার ঐ মসজিদে নামাজ পড়ার ও কবর যিয়ারত করার সুভাগ্য আমাদের হয়েছে।

তথ্য সুত্র- আল ইসাবাহ, ২/১১ পৃঃ, তাওয়াল্লী তাসীস, ৩৭ পৃঃ, তারীখে বাগদাদ, ২/৫৮ পৃঃ)। মানাকিব বাইহাকী, ১/৪৭২ পৃঃ, তাওয়াল্লী তাসীস, ৪০ পৃঃ, তাইসীর মুসতালাহিল হাদীস, ১০ পৃঃ)। ও “Imam Ja’afar as Sadiq”. History of Islam.


আরও পড়ুন