যে দেশে এমপিদের সুযোগ-সুবিধা না পাওয়াটাই রীতি

এমপি। সে তো স্বপনের পেশা। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার পেশা। ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য সুবিধাজনক এক পেশা। সাধারণত আমাদের এই উপমহাদেশে বিষয়টি বেশ চর্চিত হয়ে থাকে। কিন্তু সুইডেনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারে আলাদা।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সুইডেনে রাজনীতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এখানে এমপি হওয়াটা জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে একটি চাকরির মতো। ফলে খুব ভালো অংকের খরচ, আর নানারকম বাড়তি সুযোগ সুবিধা পাওয়া তো দূরের কথা, বরং জনগণের করের টাকা খরচের ব্যাপারে সুইডেনে সংসদ সদস্যদের উপর অত্যন্ত কড়াকড়ি রয়েছে।

এমপিরা সাধারণ নাগরিক:

সুইডেনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একজন সংসদ সদস্য হলেন প্রি-অর্নে হাকানসন। তিনি বলেন, ‘আমরা হচ্ছি দেশের সাধারণ নাগরিক, এখানে আমাদের জন্য ভিআইপি সুবিধা বলতে কিছু নেই। সাধারণ নাগরিকদের মত চলতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ আমাদের কাজ হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। তারা যে অবস্থায় বা যেভাবে বসবাস করছেন, সেটাকেই তুলে ধরা।’

এমপিদের যাতায়াত:

সুইডেনের সংসদ সদস্য প্রি-অর্নে হাকানসন বলেন, ‘এখানে একমাত্র রাজনীতিবিদ হিসাবে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ি পান। আমরা শুধু বলতে পারি, আমাদের সুবিধা এটাই যে, আমরা এই কাজটি করতে পারছি। আর দেশ পরিচালনায় প্রভাব রাখতে পারছি।’

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সুইডেনের সংসদ সদস্যরা কোন গাড়ি বা চালক পান না। তবে তারা পাবলিক পরিবহনে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারেন। এমনকি সুইডেনের পার্লামেন্টের মাত্র তিনটি ভলভো এস-এইটটি আছে, যা শুধুমাত্র সরকারি অনুষ্ঠানের কাজে পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট এবং তিনজন ভাইস-প্রেসিডেন্ট ব্যবহার করতে পারেন।

দেশটির পার্লামেন্টের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কোন ট্যাক্সি সার্ভিস নেই। সংসদ সদস্যদের বাড়িতে বা কাজের স্থানে আনা নেওয়ার জন্য এসব গাড়ি নয়।’

এমপিদের মজুরি:

সুইডেনের সংসদ সদস্যরা মাসে আয় করেন গড়ে ৬৯০০ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের একজন কংগ্রেস ম্যানের মাসিক বেতনের অর্ধেক। আর সরকারি কর্মীদের গড় মাসিক আয় প্রায় ২৮০০ ডলারের মতো।

এমপিরা অর্থনৈতিকভাবে যে সুবিধা পান:

যেসব সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকা স্টকহোমের বাইরে, তারা ‘ট্রাটামেন্ট’ নামের একটি বিশেষ ভাতা দাবি করতে পারেন। তারা যদি এটি দাবি করেন তখন তাদের দেওয়া হয়। এছাড়া নয়। আর সেই ভাতা হচ্ছে, যে কদিন তারা রাজধানীতে থাকবেন, ততদিনের জন্য একটি দৈনিক ভাতা।

এই ভাতার পরিমাণ হলো, প্রতিদিনের জন্য মাত্র ১২ ডলার। এই অর্থ দিয়ে স্টকহোমে একবেলার জন্যও খুব বিলাসী কোন খাবার কেনা যায় না। কফি কেনার জন্যও এমপিদের নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করতে হয়।

পার্লামেন্টের নথিপত্রে দেখা যায়, বেতন দেওয়ার বিষয়টি এজন্য চালু করা হয়েছে, যাতে কোন নাগরিকের জন্য রাজনীতি করা কঠিন না হয়ে পড়ে। কিন্তু সুইডিশরা এটাও চান না, এই বেতন যেন আবার তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

১৯৫৭ সাল থেকে সুইডেনের সংসদ সদস্যরা বেতন পেতে শুরু করেন। এর আগে তারা পেতেন না। তার বদলে দলের কর্মীরা এই সংসদ সদস্যদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতেন।

আবাসন সুবিধা:

সুইডেনের সংসদ সদস্যরা ভর্তুকি মূল্যের আবাসন পেতে পারেন। তবে শুধুমাত্র তারাই পাবেন, যারা স্টকহোমে থাকেন না। আর তাদের সেই থাকার জায়গাটি কোন বিলাসবহুল স্থান নয়।

সংসদ সদস্য প্রি-অর্নে হাকানসন বলছেন, ‘তিনি থাকেন মাত্র ৪৬ বর্গমিটারের একটি ফ্লাটে। আর এসব ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন বা ডিসওয়াশারের মতো আসবাবপত্রও থাকে না। আসবাব বলতে এখানে শুধুমাত্র একজনের থাকার মতো একটি সিঙ্গেল বেড রয়েছে।’

এসব ফ্লাটে একরাত থাকতে হলে এমপির সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের অর্থ দিতে হবে। যদি কোন সংসদ সদস্য তার সঙ্গীর সঙ্গে থাকতে চান, তাহলে ভাড়ার অর্ধেক তাকে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।

এছাড়া ব্যক্তিগত সহকারী বা উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে সুইডিশ সংসদ সদস্যদের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।


আরও পড়ুন