রাজশাহীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে ঈদ আনন্দ

দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

কখনও রোদ, কখনও মেঘ! রোদ-মেঘের এই লুকোচুরি খেলার মাঝে রাজশাহী মহানগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোয় মানুষের ঢল নেমেছে। মহানগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে পরিবার-পরিজন কিংবা প্রিয়জন নিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

মহানগরীর শহীদ জিয়া শিশুপার্ক, বড়কুঠি পদ্মার পাড়, একটু দূরেই থাকা সীমান্ত অবকাশ, সীমান্তে নোঙর, শহীদ কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা এবং ভদ্রা শিশুপার্কসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়ছে।

ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রাজশাহীর বাইরে থেকে আসা মানুষও দীর্ঘদিন পর বিনোদনকেন্দ্রে আনন্দ উপভোগ করতে আসছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। সবচেয়ে বেশি ভিড় জিয়া শিশু পার্ক ও পদ্মা গার্ডেনে। সেখানে শিশুদের সঙ্গে যেন বড়রাও শিশু হয়ে গেছেন। শহরের এই বিনোদন কেন্দ্রে সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যেন নিংড়ে তুলে নিচ্ছেন নিজেদের পেছনে ফেলে আসা পরমানন্দ।

আবহাওয়া যাই হোক না বিনোদন পিপাসুদের কোনোভাবেই চার দেয়ালের মাঝে আটকানো যায়নি। ঈদের আনন্দ উপভোগের করতে একযোগে বেরিয়ে পড়েছেন। তবে শহরে আজ বেড়ানোর অন্যতম বাহন রিকশার কদর তুঙ্গে, ভাড়াও বেশি। মৌসুমি রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে বিনোদনকেন্দ্রমুখী মানুষের কাছ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া হাঁকাচ্ছেন। এতে বেকায়দায় পড়ছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। আর উটকো যানবাহনের কারণে শহীদ জিয়া শিশু পার্কসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টেই যানজট দেখা গেছে।

পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে রুচিকাকে নিয়ে জিয়া শিশু পার্কে আসা সুলতানাবাদ এলাকার মাহফুজ আহমেদ বলেন, রাজশাহী শহরের জ্যামও এখন ঢাকার মতোই বাড়ছে। এই কারণে তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে সাধারণত কোথাও যাওয়াই হয় না।মেয়ে তার পছন্দ মতো বিভিন্ন রাইডে চড়তে চাইছে। তাকে সেই সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। একমাত্র মেয়ের আনন্দই তাদের ভালো লাগছে জানান মাহফুজ।

আশরাফুল আলম নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, তার সাত বছরের মেয়ে তানজিলা বায়না ধরেছে এখানে আসবে।  নানান ব্যস্ততা শেষে মেয়েকে নিয়ে শিশু পার্কে এসেছেন। এতে মেয়র খুশি আর ধরছে না। মেয়ের খুশিতে তিনিও আনন্দিত। মেয়ের সঙ্গে তিনিও বিভিন্ন রাইড উপভোগ করছেন বলেও জানান।

এছাড়া রাজশাহী মহানগরীর বড়কুঠি এলাকায় রয়েছে বিনোদনের অন্যতম স্থান পদ্মাপাড়। ঈদে রাজশাহীবাসীর জন্য বরাবরই তা বিনোদনের সেরা ঠিকানা। নির্মল বাতাস আর নৈসর্গিক পরিবেশে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে তাই বিনোদনপিপাসুদের ঢল নেমেছে পদ্মাপাড়ে।

এখন আর সকাল নেই, দুপুর নেই, সব সময় পদ্মাকে ঘিরে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত থাকছে রাজশাহীর পদ্মার পাড়। মানুষের বিনোদনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পদ্মার ধার ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে সুদৃশ্য ওয়াকওয়ে। উন্নতমানের এ সড়ক দিয়ে সহজেই বিনোদনপিপাসুরা হেঁটে পদ্মার অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে পারছেন। কাটাতে পারছেন ঈদের অখণ্ড অবসর। কারণ রাজশাহীর সবকিছুই পদ্মাকে ঘিরেই। গ্রীষ্ম, শীত, বর্ষা কিংবা শরৎ, সব ঋতুতেই পদ্মা নদীকে ঘিরে মানুষের আনাগোনা।

গ্রীষ্মে শুকিয়ে কাঠ পদ্মা আর বর্ষায় জলে টইটম্বুর; সব সময় রাজশাহীর মানুষকে কাছে টানে বিশাল এই পদ্মার পাড়। আর ঈদের মতো উৎসব হলে তো কথাই নেই। বিনোদনপিয়াসীদের কাছে সেরা ঘোরাঘুরির স্পট হিসেবে প্রথম পছন্দ পদ্মাপাড় ঈদের দিন থেকে এ পদ্মার পাড় মুখরিত হয়ে থাকছে বিনোদনপ্রেমীদের পদচারণায়। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের ভালোলাগার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু বলতে রাজশাহীর পদ্মার পাড়। সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত অবধি পদ্মার কূলে মানুষের আনাগোনা থাকে। সারাদিন হৈ চৈ, আনন্দে মাতামাতি, ছোট ছোট নৌকায় পাড়ি দেওয়া- এ নিয়ে এখন মুখরিত পদ্মা নদীর পাড়।

পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে ব্যবসা-বাণিজ্যও এখন জমজমাট। মানুষের আনাগোনায় মুখরিত নদী পাড়ে তাই গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক বাণিজ্যকেন্দ্র। বুলনপুর এলাকায় ‘আড্ডা’ সেখান থেকে পেরিয়ে সামান্য এগোলেই চোখে পড়ে ‘টি-বাঁধ’। তার পাশেই ছোট পরিসরে পার্ক তৈরি করেছে বিজিবি। এখানে নির্মাণ করা হয়েছে ‘বহির্নোঙর’ আর ‘সীমান্ত নোঙর’। হালকা সব ধরনের খাবারের আয়োজন রয়েছে এখানে। সেই সঙ্গে ছোট ছোট আমবাগানের ফাঁকে ফাঁকে বসার সুরম্য স্থান।

আর ‘বহির্নোঙর’ ও ‘সীমান্ত নোঙর’ পেরিয়ে অল্প সামান্য হাঁটাপথ পেরুলেই চোখে পড়ে সুদৃশ্য গ্যালারি সমৃদ্ধ মুক্তমঞ্চ। এটি লালন শাহ পার্ক। আঁকাবাঁকা সিঁড়ির মতো সাজানো-গোছানো গ্যালারিতে বসে অনায়াসে দেখা যায় পদ্মার অপরূপ রূপ। পাল তোলা নৌকার কলকলিয়ে ছুটে চলার অনুপম দৃশ্য না থাকলেও স্রোতস্বিনী পদ্মার বয়ে চলার দৃশ্য মানুষকে আনন্দ দিচ্ছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশন এ পার্কের দেখভাল করে। এখানে যে কোনো বড় অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে বিস্তৃত মুক্তমঞ্চ। এই লালন শাহ পার্ক পেরিয়ে এগিয়ে গেলে অদূরেই রয়েছে হযরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার। নদীর পাড় ঘেঁষে এ মাজারের অবস্থান। মাজার জিয়ারত কিংবা পরিদর্শনে এসে এক পলকের দেখা মেলে পদ্মা নদীর। মাজার সড়কের এপারেই নদীর ঘাট পর্যন্ত সুরম্য সিঁড়ি করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বর্ষাকালে এখানে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া মেলে পদ্মার স্বচ্ছ পানি এর পর মাজার শরীফ থেকে সোজা পূর্বদিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় মানুষের জটলা। তরুণ-তরুণীদের হৈ-চৈ। আড্ডা। সঙ্গে পাখির কিচির মিচির শব্দও কানে ভেসে আসে। এটি পদ্মা গার্ডেন। মিনি পার্কও বলা যায় এটিকে। সকাল থেকে বিকেল এ পার্ক তরুণ-তরুণীদের আড্ডায় মুখরিত থাকে।

মহানগরীর বড়কুঠি পদ্মার পাড় ও বিজিবির সীমান্ত অবকাশ নোঙর এলাকায় শিশু সন্তানদের নিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে অনেকেই অনেকভাবে জানান তাদের আনন্দ অনুভূতির কথা।

বাবা আরাফাত হোসেনের সঙ্গে সীমান্ত নোঙরে বেড়াতে আসা পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে রাফিয়া হোসেন ইরা জানায়, পদ্মাপাড়ে বেড়াতে তার কাছে ভীষণ ভালো লাগছে। সে ফুচকা খেয়েছে, পেয়ারা খেয়েছে। কিনেছে বেলুনও। এখনে আসার পর ঈদের আনন্দ যেন দ্বিগুণ মনে হচ্ছে তার কাছে।

মহানগরীর সিরোইল এলাকা থেকে আসা শান্ত, আফতাব ও সৈকত জানান তারা সবাই বন্ধু। চারিদিকে ঈদের উৎসব চলছে। কিন্তু সব কিছুর চেয়ে পদ্মা নদীর পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য আর নির্মল বাতাস তাদের বেশি ভালো লাগে।

এখন  সকাল, বিকেল বা সন্ধ্যা নেই। সব সময়ই বিনোদন পিপাসুদের ভিড়ে কোলাহলমুখর হয়ে থাকছে চিত্তবিনোদনের কেন্দ্রগুলো। নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। ঈদের দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই চিড়িয়াখানায় ভিড় উপচেপড়া।

মেঘ, বৃষ্টি ও ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ সপরিবারে যাচ্ছেন চিড়িয়াখানার নৈসর্গিক পরিবেশে কিছুটা আনন্দঘন সময় কাটাতে। মানুষের আনন্দ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে চিড়িয়াখানার পশু-পাখি। তবে তাদের নিরাশ করেছে বাঘ ও সিংহের না থাকা। দর্শনার্থীদের মূল আকর্ষণ বাঘ ও সিংহ হলেও তারা নেই। প্রায় এক যুগ থেকে তাদের খাঁচা খালি। ফলে হতাশ হচ্ছেন অনেকেই।

এরপরও ঈদের ছুটিতে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থী অন্য সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। মানুষের ভিড় সামলাতে লোকবল না বাড়ানো গেলেও উদ্যান ও চিড়িয়াখানাজুড়ে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।

এই চিড়িয়াখানায় বর্তমানে রয়েছে ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২২ প্রজাতির পাখি, তিন প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী। ঈদের দিন থেকে বিপুল দর্শনার্থীর আকর্ষণও ছিল তারা। ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন বাধাগ্রস্ত হয়েছে হাজারো মানুষের সরব উপস্থিতিতে। সচেতনতার অভাবে অনেকের আচরণ উৎপীড়নের পর্যায়েও গেছে।

ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ আবদ্ধ এসব প্রাণী দেখে, তাদের সঙ্গে নানা রকম মিথষ্ক্রিয়া করে আনন্দ পেলেও প্রাণীদের জন্য তা সব সময় সুখকর ছিল না।

অনেক প্রাণী দিনের বেলায় নির্দিষ্ট সময় ঘুমায়। বেশি মানুষের উপস্থিতিতে যেমন তাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটেছে; আবার অনেককে দেখা গেছে ঢিল ছুড়েছে বা নানা হাঁকডাক করে ঘুমন্ত প্রাণীকে জাগানোর চেষ্টা করছেন। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোনো কোনো প্রাণীকে খাবার দিয়েছেন কেউ কেউ। সেলফি তুলতে গিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনীও পার হয়েছেন অনেকে। ঝুঁকির বিষয়টিও উপেক্ষা করছেন।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব মতে, ঈদের প্রথম দিন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় এসেছে। এরপর থেকে ভিড় তারচেয়ে বেশি।

সজীব, খোরশেদ, হৃদয়রা নয় বন্ধু চিড়িয়াখানায় এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত থেকেও পুরোটা ঘুরে দেখতে পারেনি। নবম শ্রেণি পড়ুয়া এই ছেলেরা একই রকম পাঞ্জাবি গায়ে দাঁড়িয়ে ছিল বানরের বেষ্টনীর সামনে।

শুধু তারা নয়, অনেকেই পরিবার নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে। তবে দর্শনার্থীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বেশির ভাগ অভিভাবককেই শিশুদের প্রাণী চেনাতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে অজগর বেষ্টনীর সামনে। খাঁচার মধ্যে গাছের সঙ্গে পেঁচিয়ে থাকা প্রাণীটি শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মনেই আনন্দ খোরাক জুগিয়েছে। বাবাদের কাঁধে ছিল সন্তান। অনেকে ব্যস্ত ছিলেন সেলফি তুলতে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে প্রধান ফটকের সামনেই থাকা সুদৃশ্য লেকে বিনোদনপ্রেমীরা নেমে বোট চালাচ্ছেন। নয়নাভিরাম পুকুর ও লেকের পাড় ও এর ওপর পরী সুদৃশ্য ভেনাস দ্বীপের পাশে নির্মিত দু’টি কার্ভ সেতুতে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে কেউ বা ছবি তুলছেন, কেউ তুলছেন সেলফি।

মনোরম ওয়াকওয়েগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। দক্ষিণের সবুজ পাহাড় ও তার ওপর ফোয়ারার পাশেও মানুষ ছবি তুলছেন। ছোট-বড় সবার জন্য বিনোদনের একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশুদের চিত্তকে প্রফুল্লকরণের উদ্দেশে নির্মিত ফেরিজ হুইল ও চিলড্রেন কর্নারও ছোটদের হৈ-হুল্লোরে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে এখন। পার্কের মনোরম পরিবেশে সবুজের কারুকার্য দেখে সাবই মনের খোরাক মেটাচ্ছেন। ঘুরে বেড়ানোর জন্য উদ্যানটি উপযোগী। 

রাজশাহী শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধায়ক ও ভ্যাটেনরি সার্জন ডা. ফরহাদ হোসেন জানান, ঈদের দিন থেকে পরবর্তী সাতদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এখানে। এজন্য নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। ভেতরে ও বাইরে পুলিশ টহলের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বাইরে র‍্যাবের টহল রয়েছে। সব মিলিয়ে সবাই নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ঈদের দিন থেকে উদ্যান ও চিড়িয়াখানার সবুজ পরিবেশে ঈদ আনন্দ উপভোগ করছেন।


আরও পড়ুন