‘অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ (ভিডিও)

১১ই আগস্ট, দ্বিতীয় অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টালের ৪৮তম বার্ষিকী। সাড়ে চার দশক আগে এদিন, সকল নিরাপত্তার বেড়াজাল ছিন্ন করে পরিচালিত হয় এক অবিশ্বাস্য গেরিলা অপারেশন।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, নামটির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। ১৯৭১ সালে এখানেই দুই দফা (৯ই জুন এবং ১১ই আগস্ট) আক্রমণ চালিয়েছিলেন সেক্টর দুইয়ের অধীন ক্র্যাক প্লাটুন খ্যাত গেরিলারা। অত্যন্ত সফল এ দুটি অভিযানের মাধ্যমেই মূলত বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয় পুরো পৃথিবী।

২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে সূচিত বর্বর গণহত্যা চাপা দিতে, পাকিস্তানী প্রচারযন্ত্র অব্যাহতভাবে প্রচার চালাতে থাকে যে, ‘বাংলাদেশে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক ও ঢাকা শহর পুরোপুরি পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে’। পাকিদের এই মিথ্যা প্রচারের কারণে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা বিশ্ববাসী জানতে পারেনি। উল্টো জুন মাসে বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) দুটি দল সাহায্য দিতে বাংলাদেশে আসেন। তারা উঠেছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। সাহায্য দেওয়া বন্ধ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গেরিলা দল ৯ জুন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গ্রেনেড হামলা চালায়, যেটি মূলত ঢাকায় পরিচালিত প্রথম গেরিলা অপারেশন – ‘অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল – হিট এ্যান্ড রান’। সম্বল মাত্র ১২টি হ্যান্ড গ্রেনেড। লক্ষ্য একটাই – ঢাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উঠবেন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। এর আশেপাশে ৬ থেকে ৮ মাইলের মধ্যে চালাতে হবে অপারেশনটা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা যাতে বুঝতে পারেন যে, ঢাকা এখন আর পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং বাংলার প্রতিটি মানুষ পাকিস্তানীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।

৯ জুন, ১৯৭১। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে ধীরে ধীরে। নীরবতা ভেদ করে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বেজে উঠল। ময়মনসিংহ রোড ধরে পুলিশের গাড়ির পেছনে আসছে আরো তিনটি গাড়ি। মুক্তিযুদ্ধাদের ছোড়া গ্রেনেডে প্রকম্পিত হলো পুরো এলাকা। এক এক করে ফাটতে থাকল গ্রেনেড। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিদের বহনকারী গাড়িটি লাফিয়ে উঠল শূন্যে। একদিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য, অন্যদিকে দেশের অত্যাচারিত নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। পাকিস্তানীদের সশস্ত্র পাহারা ডিঙিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আক্রমণ চালিয়ে অক্ষত অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা সত্যিই অকল্পনীয়। তবুও নিরাপদে ফিরেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সফল আক্রমণ চালিয়েই ফিরেছিলেন। ক্র্যাক না হলে এরকম কাজ কেউ করতে পারেনা। সেই থেকে তারা ক্র্যাক প্লাটুন নামেই পরিচিত।

দ্বিতীয়বার হামলা করা হয় ১১ আগস্ট ১৯৭১, বুধবার। দ্বিতীয় সে অভিযান ছিল প্রথমটির চাইতে বিপদজনক ও গেরিলারা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সফল হয়েছিলেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল দ্বিতীয় অপারেশনের মূল নায়ক ছিলেন শহীদ মো. আবু বকর বীরবিক্রম ও আবদুস সামাদ বীর প্রতীক। এই অপারেশনের জন্য তাঁরা সুযোগ খুঁজছিলেন অনেকদিন ধরেই। কিন্তু প্রথম দফা গ্রেনেড হামলার পর থেকেই হোটেলে কড়া পাহারা। অকারণে দূরের কথা, প্রয়োজনেও সেখানে ঢোকা বেশ কষ্টসাধ্য। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, যে করেই হোক অপারেশন করতে হবে। একটা উপায়ও বের হলো।

থাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটা অফিস ছিল হোটেলের শপিং আর্কেডে। আবদুস সামাদ খবর পান, ব্যবসায়িক মন্দার কারণে তা ওই হোটেলেরই ছোট এক কক্ষে স্থানান্তর হবে। তিনি নিয়নসাইন ও সাইনবোর্ড তৈরির ব্যবসা করতেন। হোটেলের বেশির ভাগ দোকানের নিয়নসাইন তাঁর করা। তিনি কাজটি নিয়ে নেন এবং এর সূত্র ধরেই হোটেলে কয়েক দিন রেকি করেন। তারপর সবাই মিলে আলোচনা করে, সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বারের বিপরীত দিকে পুরুষদের প্রসাধনকক্ষের কোণে বিস্ফোরক রাখা হবে।

১১ আগস্ট সকালে, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বকরের এক সহযোদ্ধা বায়তুল মোকাররম মার্কেট থেকে একটি ব্রিফকেস কিনে আনেন। ব্রিফকেসের ভেতরে তাঁরা সাজিয়ে রাখেন ২৮ পাউন্ড ‘পিকে’ (প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ) ও ৫৫ মিনিট মেয়াদী টাইমার। তারপর বিকেলে গাড়িতে চেপে রওনা হন শহীদ আবু বকর বীর বিক্রম, আবদুস সামাদ বীর প্রতীক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম ও গোলাম দস্তগীর বীর প্রতীক। হোটেলের গাড়ি পার্কিংয়ে পৌঁছে শহীদ আবু বকর ও সামাদ হোটেলের ভেতরে ঢুকেন। বাকি দুজন গাড়িতে স্টেনগান নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন।

হোটেল লাউঞ্জের মূল দরজা দিয়ে না ঢুকে ‘সুইস এয়ারের’ অফিস কক্ষের দরজা দিয়ে তাঁরা ভেতরে যান। এ ব্যাপারে সহায়তা করেন ওই অফিসেরই এক কর্মচারী। ব্রিফকেস হাতে শহীদ বকর প্রসাধনকক্ষের একদম শেষ কক্ষে ঢুকে দরজা আটকে দেন। সামাদ বাইরে থাকেন কাভার হিসেবে। ভেতরে তিনি টাইমার চালু করে ব্রিফকেস রাখেন কমোডের পেছনে। তারপর দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে রেখেই দেয়াল টপকে বেরিয়ে আসেন। দুজন সোজা চলে যান অপেক্ষমাণ গাড়ির কাছে। গাড়িতে ওঠামাত্র দ্রুত সেটি বেরিয়ে যায়।

ঠিক ৫৫ মিনিট পরই ঘটে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। হোটেলের লাউঞ্জ বার, শপিং আর্কেড ও আশপাশের কক্ষের কাঁচ চুরমার হয়ে পড়ে। ছিটকে যায় দরজা, ভেঙে পড়ে কক্ষের ভেতরের ও লাউঞ্জের লাগোয়া দেয়াল। ২০ জনের অধিক আহত হয়, তন্মধ্যে ১৫ জন হাসপাতালে স্থানান্তরিত হন, তার মাঝে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। পাকিস্তানী অমানুষদের দম্ভ চুরমার হয়ে যায়। পরদিন বিশ্বজুড়ে বড় বড় পত্রিকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মুক্তিবাহিনীর অভিযানের সচিত্র খবর প্রকাশিত হয়। অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদেও প্রকাশিত হয় গেরিলা হামলার সংবাদটি।

ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন


আরও পড়ুন