পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে উড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা

আগষ্ট ১৯৭১। ঢাকার অভ্যন্তরে মুহুর্মুহু গেরিলা অপারেশনে দিশেহারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। রাত-দিন সর্বত্র ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে গ্রেনেড বা বোমা বিস্ফোরণের শব্দ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে রাতে এই ধরণের বিস্ফোরণের শব্দ না শুনলে ঘুমই আসতো না মুক্তিকামী জনতার।

এরই মাঝে এগিয়ে আসতে থাকে ১৪ই আগষ্ট ১৯৭১, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। পাকিস্তানী ও রাজাকাররা এই দিনে গর্বের সাথে উড়াবে পাকিস্তানী পতাকা, দেখাতে চাইবে বিশ্বকে বাংলাদেশের অবস্থা স্থিতিশীল, কিন্তু ঢাকায় উপস্থিত অগ্রগামী গেরিলা যোদ্ধারা ভেবেছিলেন একটু অন্যভাবে।

এবার তাঁরা পরিকল্পনা করলেন এক অন্যরকম যুদ্ধের। পাকিস্তানী পতাকাকে ম্লান করে অবরুদ্ধ ঢাকার আকাশে তাঁরা উড়াবেন বাংলাদেশী পতাকা। কিন্তু কীভাবে করবেন এই দুঃসাধ্য কাজ? তাঁদের মাথায় এলো অভাবনীয় চিন্তা। বেলুনে বেঁধে ঢাকার আকাশে উড়াবেন বাংলাদেশী পতাকা।

যেই ভাবনা সেই কাজ। একসাথে এত লাল-সবুজ কাপড় কিনলে সন্দেহ হতে পারে পাকিস্তানী বাহিনীর। তাই শাহাদাত চৌধুরী সদরঘাট থেকে কিনে আনেন অনেকগুলো সবুজ লুঙ্গী আর লাল রঙ্গের পুরনো কাপড়। বীর প্রতীক হাবিবুল আলম নিউমার্কেট থেকে কিনে নেন অনেক হলুদ রঙ্গের কাপড়।

হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের পরিবার চার বোন শায়মা, আসমা, রেশমা, শাহনাজ মিলে রাত ভর শুরু করেন বাংলাদেশী পতাকা বানানো। সাথে ছিলেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী ও তাঁর পরিবার। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই নিঃস্বার্থভাবে গেরিলাদের সহায়তা দিয়ে যাওয়া এই চিত্রশিল্পী ও তার পরিবারও বানিয়েছিলেন অনেক পতাকা। মগবাজার দিলু রোডের অনেক নারীও অংশ নিয়েছিলেন পতাকা বানাবার মিশনে। সব মিলিয়ে সেলাই হয়েছিল প্রায় আড়াই শতাধিক পতাকা।

গেরিলা যোদ্ধা মরহুম মাসুদ সাদেক চুল্লু, ধোলাইখাল থেকে যোগাড় করেন একটি গ্যাস সিলিন্ডার, সেই সাথে পুরনো ঢাকা থেকে যোগাড় করেন প্রচুর বেলুন। সব যোগাড় করে রাখা হয় ধানমন্ডিতে।

অবশেষে নির্ধারিত দিনে ১৪ই আগস্ট ১৯৭১, পাকিস্তানী আর স্বদেশী বেঈমানরা যখন ব্যস্ত তাদের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে, ঠিক তখনই সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষ করে এক অবাক করা ঘটনা। বিভিন্ন স্থাপনায় পাকিস্তানী পতাকা থাকলেও আকাশ ভরে যাচ্ছে বাংলাদেশী পতাকায়। প্রতিটি পতাকার সাথে দু’কোনায় বাঁধা দু’টি বেলুন, আর তার উপর ভর করে গর্বের সাথে আয়েশী ভঙ্গীতে উড়ে চলছে বাংলাদেশী পতাকা।

একটি দুটি নয়, শত শত পতাকা উড়ে বেড়াচ্ছে শরতের আকাশে। গর্বে ফুলে ওঠে বাঙ্গালীদের হৃদয়, মুক্তির সংগ্রামে সহায়তায় আরো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় তারা। সেদিনের উদ্দেশ্য ছিলো পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ ঢাকার আটকে পড়া বাঙ্গালিদের আশা দেওয়া, মুক্তি আসছে শীঘ্রই।

আর তৃতীয় শ্রেণীর গর্দভ পাকিস্তানীরা কিছুক্ষণ পরই আকাশের দিকে গুলি করতে থাকে পতাকা লক্ষ্য করে। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ পরেই তারা বুঝতে পারে, এই দেশের মাটি আর বাতাসের সাথে মিশে আছে এই অগণিত পতাকার অস্তিত্ব, সামান্য গুলিতে তা নিশ্চিহ্ন করা যাবে না কখনোই।


আরও পড়ুন