বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদ মিছিল করেছিলেন কিশোরগঞ্জের তরুণরা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকপ সপরিবারে হত্যার প্রথম প্রতিবাদ হয়েছিলো কিশোরগঞ্জে। হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল তৎকালীন মহকুমা শহর কিশোরগঞ্জ। তাৎক্ষণিক ঝটিকা মিছিল বের করেন একদল প্রতিবাদী তরুণ। তাদের কণ্ঠে ছিল ‘মুজিব হত্যার পরিণাম বাংলা হবে ভিয়েতনাম, বঙ্গবন্ধুর রক্ত বৃথা যেতে দেব না’ ইত্যাদি শ্লোগান।

রেডিওতে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনেই তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা সর্বাগ্রে প্রতিবাদ করেন। তারা শহরের গৌরাঙ্গ বাজারস্থ দলীয় কার্যালয়ে এসে জড়ো হন। এতে উপস্থিত ছিলেন জেলা সিপিবির প্রয়াত সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম, বর্তমান জেলা গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন, অ্যাডভোকেট গোলাম হায়দার চৌধুরী, জেলা সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট অশোক সরকার, গণতন্ত্রী পার্টির নেতা হাবিবুর রহমান মুক্তু, হাওর গবেষক ড.হালিম দাদ খান রেজোয়ান, জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিকি সম্পাদক পীযুষ কান্তি সরকার, সিপিবি নেতা ডা. এনামুল হক ইদ্রিছ, অ্যাডভোকেট রফিক উদ্দিন পনির, অলক ভৌমিক, গোপাল দাস, সাংবাদিক-আইনজীবী আলী আজগর স্বপন, প্রয়াত সেকান্দর আলী, আকবর হোসেন খান, নূরুল হোসেন সবুজ, অরুণ কুমার রাউত, আব্দুল আহাদ, নির্মল চক্রবর্তী, সাইদুর রহমান মানিক ও সৈয়দ লিয়াকত আলী বুলবুল, যারা তখন জড়িত ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে।

প্রতিবাদকারীদের অন্যতম নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র ভৌমিক দোলন বলেন, ‘রেডিওতে ঘাতকদের গলায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার ঘোষণা শোনে আমাদের রক্তে আগুন জ্বলে। সারা শহর তখন থমথম করছে। মানুষ হতচকিত ও বিহ্বল। এরই মধ্যে আমরা ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে সমবেত হতে থাকি। সকাল ৯টার দিকে আমরা একটি ঝটিকা মিছিল বের করি নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে।’

আরেক প্রতিবাদকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান মুক্তু বলেন, ‘মিছিলটি কোনক্রমে শহর প্রদক্ষিণ করতে না করতেই পুলিশ দ্রুতবেগে এসে আক্রমণ করলে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। আমাদের বাসায় বাসায় হানা দেওয়া হয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন চরম স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করে। ফলে আমরা কিছুদিনের জন্য আত্মগোপনে চলে যাই।’

হাওর গবেষক ও লেখক ড.হালিম দাদ খান রেজোয়ান বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার প্রথম প্রতিবাদ হয়েছিলো কিশোরগঞ্জে এবং বরগুনায়। কিশোরগঞ্জের রঙমহল সংলগ্ন জাহেদের চায়ের দোকানের সামনে আমরা একত্রিত হয়ে এ মিছিলটি বের করা হয়।

মহকুমা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে মিলিত হই। এ সময় পুলিশের একটি দলকে আমরা দেখতে পাই কিন্ত তারা সে সময়ে বাঁধা দেওয়ার আদেশ পায়নি ফলে মিছিলটি ছত্রভঙ করতে পারেনি। ইতিহাসে অনেক হত্যাকান্ড হয়েছে তবে সপরিবারে এমন নৃশংস্য হত্যাকান্ড আর হয়নি। কিশোরগঞ্জের মতো যদি সারা দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডে প্রতিবাদ করতো তবে আরও বিশ বছর আগেই এ নৃশংস্য হত্যকান্ডের বিচার হতো। আর সে বিচার আগে হলে দেশ আরও আগেই এগিয়ে যেতো।

প্রতিবাদকারীদের অনেকেই বর্তমানে জীবিত নেই। কেউ কেউ ঢাকায় বা দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন। যারা জীবিত আছেন, তাদের কয়েকজন খুনিদের বিচার সম্পন্ন করে ফাঁসি কার্যকর করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যারা ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে এখনো বিদেশে পালিয়ে আছেন, তাদেরকেও অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এসে বিচারের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। সেই সাথে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন তাদেরকেও যেন সম্মাননা প্রদান করেন এমনটাই প্রত্যাশা বঙ্গবন্ধু ভক্তদের।


আরও পড়ুন