জাতীয় - প্রচ্ছদ - আগস্ট ১৬, ২০১৯

রাজনৈতিক নেতাদের উপলব্ধি হলে আগস্টের আঘাত আসত না: প্রধানমন্ত্রী

রাজনৈতিক নেতারা যদি তৎকালীন পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারতেন, তাহলে হয়ত পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের আঘাত আসত না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনের বিশাল কর্মযজ্ঞ একদিকে করা, অপরদিকে একটি দেশ, যে দেশটি ছিল পাকিস্তান নামের একটি দেশের একটা প্রদেশ। আর যে ভূখণ্ডটা চিরদিন বিদেশিদের তারাই এদেশের রাজত্ব করেছে। সেই দেশটাকে একটা দেশ হিসেবে, একটা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা- এই কঠিন কাজ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি (বঙ্গবন্ধু) করে গিয়েছিলেন।’

বঙ্গবন্ধুর দেশ শাসনকালে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেই সময় নানা চক্রান্ত চলেছে- পাটের গুদামে আগুন, থানা লুট করা, আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সাতজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, আলবদর বাহিনী অনেকেই দেশ ছেড়ে ভেগে গিয়েছিল। অনেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। আন্ডারগ্রাউন্ড বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তারা একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে শুরু করে।’

ওই সময়কার পরিস্থিতি তখনকার রাজনৈতিক নেতাদের উপলব্ধিতে আসেনি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তখনকার যে একটা অবস্থা সেই অবস্থা বুঝতেই পারেনি। একটা দেশ দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল, শোষিত ছিল তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করা হয়েছে। তারা এত সহজে ছাড়বে না। তাদের দোসররা ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর তাদের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত অব্যাহত থাকবে- এই উপলব্ধিটা তখনকার দিনে আমাদের অনেক রাজনৈতিক নেতার মধ্যেও আসেনি। তাই তারা এটা হয় নাই, ওটা হয় নাই- নানা ধরনের প্রশ্ন, কথা, লেখালেখি অনেক কিছু শুরু করেছিল।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ক্ষত-বিক্ষত একটা দেশ, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু একটা দেশ, সেই দেশটাকে গড়ে তোলা যে অত্যন্ত কঠিন-দুরূহ কাজ। এটা যে একদিনেই, একটা কথায় গড়ে ওঠে না- এই উপলব্ধি যদি সবার মাঝে থাকত, তাহলে হয়ত ১৫ আগস্টের মতো এত বড় একটা আঘাত এ দেশের ওপর আসত না।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু তখন কেউ সে উপলব্ধিটা করে নাই, এটা উপলব্ধি করতে অনেক সময় লেগেছিল তাদের। কেন তারা উপলব্ধি করতে পারে নাই, আমি জানি না। এর মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী অনেকেই আছেন।’

তিনি বলেন, ‘বাহাত্তর সালের পর থেকে পঁচাত্তর সাল পর্যন্ত অনেক লেখালেখি আছে। কেউ যদি একবার চোখ বুলান, পড়েন তখন দেখবেন কত ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভুল কথা তারা বলে গিয়েছিলেন আর সেই খেসারতটা জাতিকে দিতে হলো পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল সেই আলবদর, রাজাকার, আলশামস এবং পাকিস্তানি বাহিনীর দালাল-দোসর তাদের হাতে চলে গেল ক্ষমতা। তাদের হাতে যে ক্ষমতা চলে গেছে সেটাও বোধহয় অনেকে উপলব্ধি করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছে, হত্যা করেছে।’

‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা বিরোধিতা করেছিল, যারা কখনও বাঙালি জাতি মাথা তুলে দাঁড়াক তা চায়নি, যারা কখনও বাঙালি জাতির অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে চায়নি, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারটুকু কেড়ে নিতে চেয়েছিল তাদেরই চক্রান্ত ছিল। কারণ বাঙালি জাতির বিজয় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, এই বিজয় এরা কখনোই মেনে নিতে পারেনি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরা যেমন ওই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী, যারা সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬ দফা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের রক্ত নিয়েছে, গুলি করে হত্যা করেছে তাদের দালালি করেছে, বাঙালি হয়ে তারা ওই পাকিস্তানি হানাদার বা সামরিক শাসকদের পদলেহন করেছে। তাদের তোষামোদি করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাদের স্বরূপ উদঘাটিত হয়েছে। তারা গণহত্যা চালিয়েছে, অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে…একটা জাতিকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ওই এক বছর বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন হয়নি উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার কোনো পথ ছিল না। শিল্প-কলকারখানা সব বন্ধ ছিল। একটা দেশ সম্পূর্ণভাবে অচল। শুধুমাত্র ওই হানাদার বাহিনীর আক্রমণে গ্রামের পর গ্রাম শুধু ধ্বংস, জ্বালানো, পোড়ানো। নদীর পানি লাল হয়ে গিয়েছিল বাঙালির রক্তে।’

‘সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যখন ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা ফিরে এসে দায়িত্ব ভার নিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। এই সাড়ে তিন বছরের মধ্যে এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যেখানে এক ফোটা খাদ্য গোলায় ছিল না, এক টাকা রিজার্ভ মানি নেই। কারেন্সি নোট নেই, রাস্তা ঘাট, রেল, স্কুল-কলেজ সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত। আর লাখো শহীদের কান্না, পরিবারগুলো আর নির্যাতিত মা-বোন, আহত মুক্তিযোদ্ধা, আহত সাধারণ মানুষ তাদের পুনর্বাসন। তিন কোটি গৃহহারা মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, শরণার্থীদের পুনর্বাসন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনে আমি শুধু এটুকুই বলব, যে শোক-ব্যথা বুকে নিয়েও এ দেশের মানুষের জন্য কাজ করেছি। শুধু আমার বাবার কথা চিন্তা করে। তিনি জীবনের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন এই দেশের জন্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু আজ নেই কিন্তু তার আদর্শ রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণে শেষ কথা বলেছেন, প্রয়োজনে বুকের রক্ত দেবো। আর সেই রক্তই তিনি দিয়ে গেছেন। এই দেশের জন্য, এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য তিনি তার শেষ বিন্দু রক্ত দিয়ে গেছেন। তার রক্তঋণ শোধ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে তার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে পারলে তার সেই রক্তঋণ শোধ হবে।


আরও পড়ুন