রাজনীতি - আগস্ট ১৭, ২০১৯

তৃণমূলের আস্থা হারাচ্ছে বিএনপি

বছর দেড়েক আগে ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন, কিন্তু দলীয় চেয়ারপারসন কারাবন্দি হওয়ার পর তা এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ যাত্রায়ও ব্যর্থ বিএনপি। এক যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা এ দলটি অন্তত দশবার ঈদের আগে ‘রাজপথে আন্দোলনের’ হুমকি দিয়েছে। আন্দোলনের প্রশ্ন আসলেই দলের পক্ষ থেকে বলা হয় ‘আমাদের আন্দোলন চলছে, ঈদের পর তা জোরালো হবে’। কিন্তু ঈদের পর আর সেই কথার বাস্তবায়ন দেখতে পান না বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। প্রতি ঈদের আগে এমন আশ্বাসে আস্থা হারাচ্ছে তারা।

অনেকেই বলছেন, বিএনপির আন্দোলন হুঙ্কারে আর কথার ঝনঝনানিতেই সীমাবদ্ধ। শুক্রবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই আন্দোলন করতে না পারাকে দলের ‘দুর্ভাগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মতো আন্দোলন আমরা করতে পারছি না। আর জনসমর্থন ছাড়া এককভাবে কোনো আন্দোলনই সফল হয় না।


একের পর এক আন্দোলনের নামে নানা কথা বলায় কেন্দ্রের শীর্ষ নেতাদের প্রতি আর আস্থা রাখতে পারছেন না তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা শীর্ষ নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ। দল আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে চায় কি না; তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে অনেকের মধ্যে।

শুক্রবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য, এমন কোনো আন্দোলন করতে পারছি না যার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে বের করে নিয়ে আসতে পারব। আমরা জানি আইন-আদালতের ভ‚মিকা কী, তারা কী করছে, আর কী করছে না। তাই সুসংগঠিত হয়ে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তাকে মুক্ত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকের ভাষ্যমতে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আন্দোলন কিংবা রাজপথের কোনো কর্মসূচির ডাক দিতে দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। দূর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। এতে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে ফেলছে হাইকমান্ড। যার ফলে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। পাশাপাশি দেশের সমসাময়িক নানা ইস্যুতে আন্দোলন ভেস্তে যাচ্ছে। মুখে বললেও বাস্তবতা দিনকে দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। 

অন্য দিকে, নির্বাচনের আগে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোটের ‘ভাঙন’ ঠেকাতেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বিএনপির। সম্প্রতি মন খারাপ করে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিদায় নিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। এর আগে মনোমালিন্য করে ২০ দলীয় জোট ছেড়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ।

বিএনপির তৃণমূল নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সিদ্ধান্তহীনতা আর আন্দোলনের একই বুলি বারবার উচ্চারণের ফলে কর্মীরা আগামী দিনের তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ছে। যেহেতু দল কোন পথে এগোবে, তাই স্থির করতে পারছে না; তাই তৃণমূল কর্মীরা চরম হতাশ হয়ে পড়ছেন। আর মাথার ওপর বরাবরের মতোই হামলা মামলার হুমকি তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে সবার মধ্যে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছে।

আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হলেও ডাক আসছে না মন্তব্য করে গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, ন্যায়ের প্রশ্নে রাজপথের আন্দোলনের বিকল্প নেই। গাজীপুর মহানগর প্রস্তুত সেই আন্দোলন সফল করতে। কিন্তু আন্দোলনের ডাক কেন আসছে না বলতে পারছি না। আন্দোলনের এটাই তো মোক্ষম সময়। এখন না হলে আর কবে?


গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. মইনুল হাসান সাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের কথা শোনার মতো সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের নেই। আমরা তো কেন্দ্রের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করি। যা বলে তাই পালন করি। আমরা প্রস্তুত হলেও লাভ নেই। আন্দোলন বলে বলে আর হয় না। মাঠের ত্যাগী কর্মীরাও নিরাশ হয়ে পড়ছেন।


তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আন্দোলন বলে কয়ে হয় না। জনগণ ঠিকই একদিন ফুঁসে উঠবে। সরকার নানাভাবে নেতাকর্মীদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমীর খসরুর বক্তব্যে ঘোর আপত্তি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আন্দোলন নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ভ‚মিকা হতাশাজনক। হুঙ্কারের এই আন্দোলন কবে হবে সহসাই বলা যাচ্ছে না। বলে বলে আন্দোলন না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন তৃণমূলের ত্যাগীরা। 

বিএনপি আন্দোলনে ব্যর্থ কেন? জবাবে শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিএনপির নীতি নির্ধারণের ব্যাপারে সমন্বয় হচ্ছে না। সব কিছুর আগে দলে ঐকমত্য দরকার। নইলে সমস্যার সমাধান হবে না। সময়ের কাজ তো অসময়ে করলে হবে না।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি এখন পথহারা পথিক। তারা কোনো কূলই পাচ্ছে না। কারও সঙ্গেই তারা যোগাযোগ করছে না। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেও সমন্বয় করছে না। 


আরও পড়ুন