রাজনীতি - আগস্ট ১৮, ২০১৯

ভেঙে পড়েছে জাপার চেইন অব কমান্ড

নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এত দিন ছিল পর্দার আড়ালে-আবডালে। ভাঙছে, ভাঙবে কম করে হলেও ফাটল ধরছে-এমন আভাস ইঙ্গিতের গুরু গুরু শব্দ ছিল রাজনীতির আকাশে। গতকাল শনিবার বাস্তব রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আভাস। এ চিত্র জাতীয় সংসদের বিরোধী দল, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা-এরশাদ)। দলটিতে প্রভাব বিস্তারের খেলায় মত্ত দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ‘পার্টির চেয়ারম্যানের চেয়ার’ ধরে দেবর-ভাবির টানাটানিতে এই সময়ে এরশাদবিহীন জাপা বেতালে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপির (জিএম কাদের) ডাকে সাড়া দেয়নি একই পার্টির কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ এমপিসহ তার অনুসারী ২৫ প্রেসিডিয়াম মেম্বার। পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার সংখ্যা ৫৩ জন। বাসায় সাক্ষাৎ করে কিংবা বিশেষ ভবনে রওশন-কাদেরের গোপন বৈঠকেও দ্বন্দ্ব মিটছে না। উল্টো বিরোধ উঠছে চরমে। ফলে ভেঙে পড়েছে দলটির চেইন অব কমান্ড। 

জাপা নেতাদের ভাষ্য, বিরাজমান অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্বের লাগাম উচ্চ কোন কক্ষে। এ দ্বন্দ্ব সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন এবং প্রয়াত এরশাদের নির্বাচনী এলাকায় (রংপুর-৩) উপনির্বাচনে

 দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ওপর জাপার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তবে জাপার ভেতরে যা-ই কিছু হোক না কেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে উচ্চ কক্ষ থেকেই। এর জন্য কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। জাপার চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর আগে থেকেই নানা নাটকীয়তা ছিল।

ভোটের পাল্লা ভারী করতে এবং দেশের রাজনীতিক অঙ্গনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ভূমিকা রেখেছে। সময় সময়ে পরিস্থিতির আলোকেই সিদ্ধান্ত বা বাক্য বদল করেছেন এরশাদ। দলের বর্তমান-ভবিষ্যৎ চিন্তা থেকে কৌশল অবলম্বন করেছেন এরশাদ। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বা মহাসচিব পদে চিঠি চালাচালি করেছেন। প্রয়োজনে দিয়েছেন, প্রয়োজনে ফেরতও নিয়েছেন। সিদ্ধান্তে কলকাঠি ছিল তার হাতেই। কিন্তু এখন ভেঙে পড়েছে দলটির চেইন অব কমান্ড। দলটি স্পষ্ট দুই বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক বলয়ে জিএম কাদের অন্যটিতে রওশন। দুই শীর্ষ নেতার দুই বলয়ে ঠাঁই নিয়েছেন দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার, এমপি ও সিনিয়র-জুনিয়র নেতারাও।

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে গত ২৬ জুন থেকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গত ১৪ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর তার জানাজায় অসংখ্য লোক সমাগম ঘটে। শোকের ছায়া নেমে আসে এরশাদের নিজ এলাকা রংপুরে। শূন্য আছে একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদটি। বিধি মোতাবেক এরশাদের নির্বাচনী আসন রংপুর-৩ শূন্য ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

এদিকে বিরোধীদলীয় নেতার শূন্য পদ এবং পার্টির চেয়ারম্যান পদ নিয়ে শীতল প্রতিযোগিতা ছিল রওশন এরশাদ এমপি এবং জি এম কাদের এমপির মধ্যে। দিন যত যাচ্ছে প্রাপ্তির দাবি জোরালো হচ্ছে তাদের দুই পক্ষ থেকেই। দুই নেতার বিরোধে পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও এমপিরাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। এরশাদের মৃত্যুর পর সভা-মিলাদ করছেন জি এম কাদের গ্রুপ। তাতে অংশ নেয়নি রওশনপন্থিরা। যদিও গঠনতান্ত্রিকভাবে কাদেরই জাপা চেয়ারম্যান। কিন্তু তা মানতে নারাজ রওশন। পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা কাদেরকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করার ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে পাল্টা জবাব দিয়েছেন রওশনসহ তার অনুসারীরা। কাদেরের ডাকা সভাতে যোগ দেয়নি রওশনসহ তার অনুসারীরা। অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে রওশন এরশাদের বাসায় সাক্ষাৎ করেছেন দেবর জি এম কাদের। ভাবি হিসেবে দেবরকে দোয়া দিয়েছেন। কিন্তু চেয়ারম্যান মেনে নয়- এমন ইঙ্গিত রওশন এরশাদের।

আগামী ২৩ আগস্ট এরশাদের মৃত্যুর ৪০ দিন। ধর্মীয় বিধান মেনে ওইদিন উপলক্ষে সারা দেশে গণভোজের আয়োজন করতে চায় জাপা। এ জন্য গত শুক্রবার মহানগর নেতাদের নিয়ে সভা করেছেন কাদের। গতকাল ছিল পার্টির প্রেসিডিয়াম ও দলীয় এমপিদের নিয়ে যৌথসভা। দলের এই সময়ে ৫৩ প্রেসিডিয়াম মেম্বার আছেন। কাদেরের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন ২৮ জন।

সভাসূত্রে জানা গেছে, গতকালের প্রেসিডিয়াম মেম্বারদের সভায় অংশ নিয়েছিলেন এম এ সাত্তার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, মো. আবুল কাশেম, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি, আলহাজ সাহিদুর রহমান, অ্যাড. শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, নুর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরী, সালমা ইসলাম এমপি, সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, সুনীল শুভরায়, এস এম ফয়সল চিশতী, হাজি সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, এ টি ইউ তাজ রহমান, সোলায়মান আলম শেঠ, আবদুর রশীদ সরকার, মেজর (অব.) খালেদ আখতার, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি, পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মনির, লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এমপি, রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ দিদার বখ্ত, কাজী মামুনুর রশিদ, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, আলমগীর সিকদার লোটন, এমরান হোসেন মিয়া।

গতকালের সভা থেকে দাবি ওঠে-জি এম কাদের এমপিকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত করার। অন্যদিকে রওশনের পথ অনুসরণ করে সভা বর্জন করেছেন ২৫ জন। এদের মধ্যে আছেন সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা, মীর আবদুস সবুর আসুদ, আবু হোসেন বাবলা, সেলিম ওসমান, জিয়াউদ্দিন বাবলু, নাজমা আক্তার প্রমুখ।

তবে এর মধ্যে বাবলা ও শামীম ওসমান বিদেশে, বাবলু অসুস্থ এবং নাজমা আক্তার নিজ এলাকায় ছিলেন বলে দাবি জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার।


আরও পড়ুন