‘অ্যাটাক অন দ্য মুভ’

১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি ও জুলাই মাসে মেলাঘর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গেরিলা যোদ্ধাদের বেশ কিছু ছোট-বড় দল ঢাকায় প্রবেশ করে। মূলত এ দলটাই হল ক্র্যাক প্লাটুন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকায় সমুখ যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবার মুহূর্ত পর্যন্ত ‘কলজে পানি করে’ রেখেছিলেন ‘গেরিলা’ যোদ্ধারা।

জুলাই এবং আগস্টের শুরুতেই ঢাকায় তখন প্রবেশ করেছে সেক্টর ২-এর অধীন গেরিলাদের দলটি। আগস্টের শুরু থেকে তাঁরা একের পর এক দুঃসাহসী আক্রমণে পাকিস্তানী সেনাদের তটস্থ করে রেখেছিলেন।

২৫ আগস্ট ১৯৭১, সেদিন বুধবার, বর্ষাস্নাত ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকায় পরিচালিত হয় ক্র্যাক প্লাটুন খ্যাত গেরিলা দলের শেষ অপারেশন। এই অপারেশনের পরবর্তী পাঁচ দিনে একে একে ধরা পড়েন তাঁদের অনেকেই, যাঁদের আমরা আর কখনোই খুঁজে পাবনা। সেদিনের বিকেল বেলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষ করেছিলেন ঢাকার অন্যতম স্মরণীয় ও দুর্ধর্ষতম গেরিলা অপারেশন। এর আরেক নাম হল ‘অ্যাটাক অন দ্য মুভ’।

ধানমণ্ডি অপারেশনের অন্যতম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীর প্রতীকের কাছ থেকেই শোনা যাক সেদিনের গল্প –

আমরা প্ল্যান করলাম একটা সিরিয়াস টাইপের অ্যাকশনের। সিদ্ধান্ত হলো ২০ নম্বর রোডে (ধানমন্ডি) চায়নিজ এম্বাসি এবং ১৮ নম্বর রোডে জাস্টিস আবদুল জব্বার খানের বাসার সামনে অপারেশন করার। সেখানে পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশ প্রহরায় থাকত।‘কাজী (কাজী কামালউদ্দিন, বীর বিক্রম), বদি (শহীদ বদিউল আলম বীর বিক্রম), জুয়েল (শহীদ আবদুল হালিম জুয়েল বীর বিক্রম), রুমি (শহীদ শাফী ইমাম রুমী বীর বিক্রম), স্বপন (কামরুল হক স্বপন বীর বিক্রম) ও আমাকে নিয়ে একটি দল গঠন করা হলো।

এবার আমাদের টার্গেট ছিল ‘অ্যাটাক অন দ্য মুভ’। বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন। আগেই রেকি করা হয়েছিল। কিন্তু এর জন্য গাড়ি প্রয়োজন।গাড়ি হাইজ্যাকের ভার পড়ল আমার ও বদির ওপর। উল্লেখ্য, শহীদ আব্দুল হালিম জুয়েল সিদ্ধিরগঞ্জ অপারেশনে আঙ্গুলে গুলির আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় এ অভিযানে অংশ নেননি।

গাড়িটি ছিল মাহফুজ আনামের বড় ভাই মাহবুব ভাইয়ের। সাদা রংয়ের গাড়ি। সামনে ছোট্ট ছেলে ড্যাস বোর্ড ধরে দাঁড়িয়ে। মাহবুব ভাই খুবই ফর্সা। দেখে প্রথমে মনে করেছি, কোনো বিহারি হবেন। আমরা তিনটার দিকে বের হয়েছি। বদি হাত উঁচিয়ে গাড়িটি থামাল। ওর হাতে বন্দুক। বদি ঠাণ্ডা মাথায় বলছেন, আপনি কি অবাঙালি? তিনি বলছেন, আমি বাঙালি। বদি বলছেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আপনার গাড়িটি দরকার। আপনি নামুন, না হলে আপনার ছেলেকে মেরে ফেলা হবে। আমরা অপারেশনে যাব। আর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আপনি থানায় খবর দেবেন যে, আপনার গাড়ি ছিনতাই হয়েছে। এর আগে খবর দিলে পরিণাম খারাপ হবে।

আমরা তখন জানতাম না যে, তিনি মাহফুজ আনামের বড় ভাই। মাহফুজ আনাম আমাদের কাছে খুবই পরিচিত নাম। মাহবুব সাহেব সম্মতি দিলেন। তাদেরকে রিক্সায় উঠিয়ে দিলাম। কিছুদূর আসার পর ড্যাস বোর্ড খুলে দেখি লাইসেন্সে মাহবুব আনাম লেখা। ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি পাকিস্তানের কর্মকর্তা। তখন আমরা বুঝতে পারলাম। তবে আর কিছুই করার ছিল না। এরপর জিয়া, চুল্লু ভাই, মুক্তার আরেকটি গাড়ি নিয়ে এলো। কারণ পরপর দুটি অপারেশন করার কথা। ধানমন্ডি অপারেশন করে গভর্নর হাউজ এবং পিলখানায় অপারেশন করার কথা।

মাজদা রাইটহ্যান্ড গাড়ি। ঠিক হলো আমি স্টিয়ারিং হুইলটা ধরব। আমার অস্ত্র যাবে বদির কাছে। এ অপারেশনে শেষ পর্যন্ত জুয়েলকে নেওয়া হয়নি তাঁর হাতের জখমের কারণে। আমরা গাড়ি নিয়ে ২০ নম্বর সড়কে গিয়ে আশ্চর্য হলাম। দেখি, নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে পাকিস্তানি সেনা-পুলিশ নেই। গাড়ি টার্ন করে ১৮ নম্বরে ঢুকে পশ্চিম দিকে এগোতে থাকলাম। দেখি, ব্রিগেডিয়ারের বাসার সামনে আট জোয়ান বসে আড্ডা দিচ্ছে।

ইট ওয়াজ হার্ডলি টু-থ্রি সেকেন্ড। একটা ব্রাশ মানে দুই থেকে তিন সেকেন্ড, ১০ রাউন্ড গুলি বেরিয়ে যাওয়া। দুই লেবেলে গেল। কাজীরটা বুক বরাবর, আর বদিরটা পেট বরাবর। আমি খুব আস্তে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। আটজনই পড়ে গেল।

সহজেই কাজ শেষ হওয়ায় আমরা আনন্দিত, তারপর ধীরে গাড়ি চালাচ্ছি। স্বপন পিছন থেকে আমার জামার কলার ধরে বলছে, ‘এই আমি ফায়ার করব না? তাহলে গাড়িতে তুলেছিস কেন?’ বললাম, ‘ঠিক আছে, চল।’ ফের ২০ নং রোডে গিয়ে ৫ মিনিট অপেক্ষা করলাম। কোনো চাইনিজ নেই। স্বপনকে বললাম, ‘যথেষ্ট হয়েছে, তোমার কপালে নেই চল।’

গভর্নর হাউজে আরেকটি গাড়ির সঙ্গে মিলতে হবে। ৭ নং রোড দিয়ে যখন নিউমার্কেট রোডে এলাম তখন দেখি রাস্তায় ব্যারিকেড বসে গেছে। চার-পাঁচটি গাড়ি ইতোমধ্যেই থামিয়ে চেক করছে। আমি স্বপনকে বললাম, ‘তুমি কি চালাতে চাও?’ স্বপন বলল, ‘হ্যাঁ।’ আমি স্বপনকে বললাম, ‘দেখ সামনে একজন এলএমজি নিয়ে শুয়ে আছে। ওটাকে নিতে হবে। শেষ করতে না পারলে দুঃখ আছে।’ বদি বলছে, ‘এ পাশে আরেকটা আছে।’

আমি বললাম, ‘শেষ করা তোমাদের দায়িত্ব।’ তবে নিশ্চিত শেষ করতে হবে। ওরা থাম থাম বলছে। গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। একজন গালি দিয়ে গাড়ির সামনে আসল। আমি লাইট বন্ধ করে ডান পাশের ইন্ডিকেটার দিয়ে থামানোর ভান করলাম। এর মধ্যেই স্বপন, বদি, কামাল ফায়ার শুরু করে দিয়েছে। গুলির গরম খোসা এসে আমার পিঠে পড়ছে।

ওরা বুঝতেই পারেনি যে, গাড়ি থেকে এভাবে গুলি হতে পারে। বুঝে ওঠার আগেই আমাদের অ্যাকশন হয়ে গেছে। আমি বলেছি, ‘বামদিকে ইন্ডিকেটর দেখিয়ে ডান দিকে যাব।’ গ্রিনরোডে আসার বাঁক নিয়ে আমি নিউ মার্কেটের দিকে গেলাম। সায়েন্স ল্যাবরেটরির দেয়ালের কাছে আসতেই রুমি বলছে, জিপ আসছে। রুমি আর বিলম্ব করেনি। সঙ্গেই সঙ্গেই পিছনের গ্লাস ভেঙ্গে জিপটিকে লক্ষ্য করেই গুলি। আমি লুকিং গ্লাসে দেখলাম, জিপটি সজোরে গিয়ে একটি খাম্বার সঙ্গে ধাক্কা খেল। সম্ভবত চালকের গায়ে গুলি লেগেছিল।

রুমি আর কাজী কামাল’কে গাউছিয়ার মোড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েই বললাম, ‘এখুনি গিয়ে আম্মাকে (শহীদ জননী জাহানারা ইমাম) বল তোর বাসার উল্টো দিকের গলিতে আসতে। এই আর্মসগুলো রাখতে হবে।’ আমরা এলিফ্যান্ট রোড থেকে সরু রাস্তা দিয়ে সেই গলিতে চলে এলাম। দেখি খালাম্মা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। অস্ত্রগুলো তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে দিলাম। তিনি বাসায় নিয়ে গেলেন।

রাত আটটা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমি আর স্বপন গাড়ি নিয়ে ভূতের গলিতে ঢুকলাম। ভূতের গলিতে একটি বাড়ির সামনে গাড়িটি রেখে আমরা চুপচাপ হেঁটে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের বাড়িতে চলে এলাম। বদি এবং কামালও একই জায়গায় চলে এসেছে। সেখান থেকে আমরা ধানমন্ডি চলে গেলাম। এটিই ছিল শহীদ শাফী ইমাম রুমির শেষ অপারেশন। রুমিরা ২৯ ও ৩০ আগস্ট পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে ধরা পড়ে যায়।


আরও পড়ুন