দেশের খবর - September 7, 2019

হাওরের ২০ হাজার জেলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছে

হাওর অঞ্চলের ২০ হজারেরও বেশি জেলের জীবনে আসছে চরম দুর্দিন। পুরুষাক্রমিক মাছ ধরে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসা এইসব জেলের পরিবার যেন অসহায় হয়ে পড়েছে। একদিকে মৎস্য সম্পদ হ্রাস অন্যদিকে ইজারাদার ও প্রভাবশালী লোকজনের শোষণ অত্যাচার ইত্যাদিতে অতিষ্ঠ হয়ে ইতিমধ্যেই অনেক জেলে পরিবার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। আবার কেউ বাপ-দাদার ভিটামাটি বিক্রি করে শহরের বস্তি অথবা অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে।

হাওর অঞ্চলের কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সুনামগঞ্জ জেলার সংযোগস্থল প্রাকৃতিক ভাবেই অগণিত নদ-নদী, বিল-বাদার, হাওর-বাওরে পরিপূর্ণ। এছাড়া বর্ষায় সব মাঠ-ঘাট ও পথ পানিতে একাকার হয়ে পড়ে। আবার প্রকৃতিগত কারনে এ অঞ্চলের নদী তীরবর্তী অথবা আশে পাশের অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্যা জেলে পল্লী। পেশাগত ভাবে এ অঞ্চলে ছোট মাঝারী কৃষক আর ক্ষেত মজুর, দিন মজুর মানুষই সংখ্যা গরিষ্ট। এসব লোকজন সারা বর্ষা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে অন্যদিকে একমাত্র বোরো ফসল এই অঞ্চলের প্রধান ফসল। যাতে হেমন্তের ছয় মাস কাজ করে। অন্যদিকে এই অঞ্চলে প্রচুর মাছের উৎপাদন হওয়ায় এক সময়ের এই অঞ্চলকে দেশের মৎস ভান্ডার বলা হতো। উৎপাদিত মাছের ২০ ভাগে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে ৮০ ভাগ মাছ জাতীয় বাজার বন্দর এবং বিদেশে রপ্তানি হয়ে আসছে। ফলে এই অঞ্চলের মাছে বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনেও যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। নদী ও জলমহাল গুলোর রুই, কাতলা, আইর বোয়াল, চিংড়ি ইত্যাদি মাছ ফরিয়া ও পাইকাররা খরিদ করে কুলিয়ারচর, ভৈরব, আশুগঞ্জ, হবিগঞ্জ এমনকি চট্টগ্রাম নিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বলে অসংখ্য জেলের ভাষ্য।

স্রোত বহ নদী এবং জলমহালগুলির প্রতিটি ইজারাদার এবং প্রভাবশালী লোকজনের করায়ত্ব। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এমনকি উচ্চ পর্যায় থেকে বাৎসরিক অথবা ত্রৈ-বাৎসরিক ইজারা দেওয়া হচ্ছে বলে জেলেরা জানান। এইগুলি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির ইজারা পাওয়ার বিধান থাকলেও ইজারাদার আর প্রভাবশালী লোকজন স্বনামে বেনামে ইজারা নিয়ে যাচ্ছে বলে সচেতন জেলেরা জানান। প্রকৃত মৎস্যজীবিদের সমিতিতে ইজারা নেওয়ার পুঁজি না থাকার ফলে ইজারাদার এবং প্রভাবশালীরা কোন কোন ক্ষেত্রে অমৎস্যজীবিদের ইজারাদারদের সদস্য করে সমিতি রেজিষ্ট্রেশন করে নিয়েছে বলে বিশ্বসত সূত্রে জানা যায়। নদীগুলো ইজারাপাওয়ার সাথে সাথেই জেলেদের মাছ ধরতে না দিয়ে এবং বাঁশ কাটা দিয়ে নদীর নাব্যতা হ্রাস করা পাঁটিবাঁধ ভীম জাল সহ অবৈধ জালে মাছ ধরা ইত্যাদি সরকারি নিষেধ অমান্য করে কোটি কোটি টাকা লাভবান হচ্ছে ইজারাদার।

জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইজারাদারদের ইচ্ছা মাফিক রশিদ বিহীন নদীতে নির্ধারিত সীমানায় মাছ ধরতে হচ্ছে। তাও জেলেদের ধরা মাছ ইজারাদারদের তহবিলেই বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্ষায় ভাসান পানিতে নদীর সীমানা বহিভূত হাওর খাল এমনকি আবাদী জমিতেও ইজারাদাররা জেলেদের মাছ ধরতে দিচ্ছে না বলে জানা যায়। ফলে জেলেদের জীবন চরম বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও ইজাদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মারধর, জাল নৌকায় ধরে নেওয়া এমনকি সুযোগে জেলেদের নামে মামলা টুকে দেওয়া এ অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ঘটছে। এমনকি মাছ ধরতে গিয়ে লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে খুন হওয়ার মত সু-নির্দিষ্ট একাধিক ঘটনার দৃষ্টান্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিনিয়ত বাস্তত্যাগী পেশাত্যাগী হওয়া ছাড়া বিকল্প পথ পাচ্ছে না বলে অসংখ্য জেলের ভাষ্য।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের বংশানুক্রমে জেলে মুক্তিযোদ্ধা নগেন্দ্র দাস, পাহাড়পুরের ভূষণ দাস, সুবোধ দাস, সুনামগঞ্জের দিরাই, মজলিশপুরের হীরালাল দাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাসিরনগরের অনিল দাস, ঝন্টু দাস, সরাইলের দুলাল দাস, বানিয়াচং এর সুশান্ত দাস, রতন দাস, সুনিল দাসসহ অসংখ্যা জেলেরা জানান তাদের দুর্ভোগের কথা। এছড়াও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচেতন জেলে জানান জাল যার, জলা তার আইনে আছে বাস্তবে নেই।

এ ব্যপারে নদী গবেষণা ইনষ্টিটিউটের সাবেক মহা-পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ ইনামুল হক বলেন, হাওরের প্রার্ন্তিক জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বেশি। বদ্ধ জলাশয়ে লীজ নেওয়ার বিধান আছে, মুক্ত জলাশয়ে লীজ দেওয়ার বিধান না থাকলেও আইন না মেনেই লীজ দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি এবং জনসেবক আইনের শাসন চালু করলে এর থেকে পরিত্রান পাওয়া যাবে।


আরও পড়ুন