জাতীয় - শিক্ষা - সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯

অবশেষে গোপালগঞ্জের ভিসিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ

অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈতিক স্খলনের দায়ে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ভিসি অধ্যাপক খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি।

পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ তিনটি সুপারিশ করা হয়েছে।

রোববার ইউজিসির পাঁচ সদস্যের কমিটি প্রতিবেদনটি সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহর কাছে জমা দিয়েছে। পরে সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা একটা বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন করেছি। কমিটির সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।

এদিকে ভিসিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করে ইউজিসির প্রতিবেদনের খবরে বশেমুরবিপ্রবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্ছ্বাস ও কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। তারা এটিকে তাদের প্রাথমিক বিজয় বলে মনে করছেন। তবে চূড়ান্ত বিজয় না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। রোববারও শিক্ষার্থীরা ভিসির অপসারণের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।

ইউজিসির প্রতিবেদনের বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, দাফতরিক কাজে মন্ত্রী এবং আমি ঢাকার বাইরে অবস্থান করছি। কাল (সোমবার) মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রতিবেদন দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এর আগে মন্ত্রী ও ইউজিসি চেয়ারম্যান মিলে এ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে।

পাঁচ সদস্যের কমিটির নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম ও অধ্যাপক সাজ্জাদ হুসেন, ইউজিসির পরিচালক কামাল হোসেন। এছাড়া উপপরিচালক মৌলি আজাদ কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন।

এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম বলেন, দু’দিন ধরে তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। আমরা শিক্ষাথীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র যা দেখলাম তাতে ওটাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না। একটা বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। তবে তিনি প্রতিবেদনের বিস্তারিত বলতে রাজি হননি।

এ প্রতিবেদক কমিটির চার সদস্যের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বলেছেন, ১১ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণসহ তিনটি সুপারিশ আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিসি বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে পুরোপুরি ব্যর্থ। তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে কমিটি। এতে বলা হয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। সে ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে ভিসি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি অদূরদর্শী আচরণ করেছেন। তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের প্রমাণও পেয়েছে কমিটি। এতে বলা হয়, ভিসি খোন্দকার নাসিরউদ্দিনকে স্বপদে বহাল রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। তাকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করে বলা হয়, অনিয়ম-দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

১১ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। ভিসির অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে একজন ছাত্রী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। ওই আন্দোলন দমাতে ভিসি পেটোয়া বাহিনী লেলিয়ে দেয়। পরিস্থিতি বেশি খারাপ হলে ২৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী ইউজিসিকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক তথ্যাদি তদন্ত করে জানাতে অনুরোধ করেন।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বশেমুরবিপ্রবি ভিসির অপসারণের দাবিতে রোববারও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত ছিল। এদিন বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। দুপুর ১২টার দিকে ক্যাম্পাসের জয় বাংলা চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন।

এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. বাবুল আজাদ। তিনি বলেন, ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ভিসির মদদপুষ্ট বহিরাগত ক্যাডারদের হামলার ঘটনায় তদন্তের নামে প্রহসনমূলক ৩ সদস্যের কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এতেই প্রমাণিত হয়, প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপে বহিরাগত ক্যাডাররা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। বিকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভিসির ব্যঙ্গাত্মক ছবি অঙ্কন করেন।

এদিন ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদনের খবরে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী প্রিয়তা দে বলেন, ইউজিসির সুপারিশে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। এজন্য ইউজিসির তদন্ত দলকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশাবাদী দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে। এরপর আমরা আনন্দ নিয়ে পূজা উদযাপন করতে বাড়িতে যাব।

একই বিভাগের রেহনুমা তাবাসসুম বলেন, ইউজিসির সুপারিশ আমাদের আন্দোলনের প্রাথমিক অর্জন বলে আমরা মনে করছি। ভিসির পদত্যাগই আমাদের একমাত্র দাবি। এ দাবি পূরণ হলেই আমরা ঘরে ফিরব।


আরও পড়ুন