যুবলীগে ক্লিন ইমেজের নেতা খুঁজছেন প্রধানমন্ত্রী

খোলনলচে পাল্টে যাচ্ছে আওয়ামী যুবলীগের। ভবিষ্যৎ নেতা নির্বাচনের জন্য কাজ শুরু করছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামে এত অভিযোগ উঠেছে যে, পুরো সংগঠনটিই দূষিত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। সে কারণে গোটা যুবলীগকেই ঢেলে সাজাতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তরুণ নেতারা চাচ্ছেন যুবলীগে যেন ছাত্রলীগের মতো বয়সের সীমা টেনে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়েই যুবলীগের দীর্ঘদিনের বলয় ভাঙতে চান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর আগে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যারা সংগঠনের চেয়ারম্যান ছিলেন, তারা সরাসরি যুবলীগের অভিভাবক হিসেবে সংগঠনটির দেখভাল করতেন। কিন্তু তাদের হাতে যুবলীগের এমন পরিণতির পর এবার প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন নিজেই যুবলীগের কমিটির বিষয়টি দেখবেন। ইতোমধ্যে যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের শীর্ষ নেতা নির্বাচনের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন তিনি। 

আগামী ২৩ নভেম্বর বেলা ১১টায় রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই। যদিও অন্যান্য সময় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সম্মেলন শেষে কেন্দ্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মহানগর শাখার সম্মেলন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। কারণ সম্প্রতি ক্যাসিনো কারবারের দায়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছেন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটসহ অনেকেই। অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক খোঁজখবর নিচ্ছে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছেন ওমর ফারুক চৌধুরীর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে সারা দেশে পরিচিত সংগঠনটির দফতর সম্পাদক কাজী আনিস। ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা যুবলীগের অনেক নেতাও রয়েছেন দৌড়ের ওপর। সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো যুবলীগের প্রতাপশালী চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সভা। সেই সভা থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতির নির্দেশে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেয় যুবলীগ। 

প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, যুবলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন ইমেজকে প্রাধান্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ এই সংগঠনের বর্তমান ভাবমূর্তি তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন এমন নেতা যুবলীগে প্রয়োজন, যারা বর্তমানে তলিয়ে যাওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করে তা অব্যাহত রাখবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে যুবলীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। 

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যুবলীগের এবারের সম্মেলনে চেয়ারম্যান পদে দেখা যেতে পারে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশকে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য হলেও সবসময় নিজেকে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের আড়ালেই রেখেছেন বাংলাদেশের একটি খ্যাতনামা বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষক। তবে তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী কি না? তা জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার পরিবারের কেউ এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই শেষ ইচ্ছা বলে মত রয়েছে তাদের। 

যুবলীগের বর্তমান কমিটির দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের নাম রয়েছে শীর্ষ পদের আলোচনায়। তারা হলেনÑ মহিউদ্দীন আহমেদ মহি ও সুব্রত পাল। দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম ও আতাউর রহমান আতাও রয়েছেন আলোচনায়। ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষনেতা ছিলেন; কিন্তু বর্তমানে কোনো দায়িত্বে নেই এমন দুজন সাবেক ছাত্রনেতার নাম নিয়েও ভাবনা চলছে যুবলীগের শীর্ষ পদের জন্য। তারা হলেন বাহাদুর বেপারী ও ইসহাক আলী খান পান্না। যুবলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ ইতোমধ্যে নিজেকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে জানান দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে বয়সের কারণে তিনি এবার যুবলীগ থেকে বাদ পড়তে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। 

যুবলীগের ‘বয়সসীমা’ নির্ধারণে ভাবনা স্বাধীনতা-উত্তরকালে যুবদের রাজনৈতিক শিক্ষায় সচেতন করার লক্ষ্যে স্বাধীনতা আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি প্রতিষ্ঠা করেন যুবলীগ। ১৯৭৪ সালে প্রথম যখন জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় তখন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ৩৩ বছর বয়সি শেখ ফজলুল হক মণি। ওই সময় যুবলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৪০ বছরের একটি বয়সসীমার বিধান ছিল। তবে ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির দ্বিতীয় জাতীয় কংগ্রেসে ওই বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। ওই কংগ্রেসে ৩৮ বছর বয়সি আমীর হোসেন আমু চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৮৬ সালের তৃতীয় কংগ্রেসে ৩৭ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোস্তফা মহসীন মন্টু। ১৯৯৬ সালের চতুর্থ জাতীয় কংগ্রেসে ৪৭ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ২০০৩ সালের পঞ্চম জাতীয় কংগ্রেসে ৪৯ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর কবির নানক। এই কমিটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনটির ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেস। এই কংগ্রেসে ৬৪ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী।

সংগঠনটির নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে, যুবলীগের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বেশিরভাগই ষাটোর্ধ্ব। এ ব্যাপারে যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, যুবলীগ করার একটা বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। যুবলীগের আগামী সম্মেলনের মাধ্যমে দেশরত্ন শেখ হাসিনা একটি গতিশীল, সঠিক ও সুন্দর নেতৃত্ব উপহার দেবেন। আগামী সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটির নেতৃত্ব নির্বাচনে বয়সের কাঠামো নির্ধারণের চিন্তাভাবনা আমরা করছি। এ বিষয়ে তারা নেত্রীর কাছে সুপারিশ করবেন।


আরও পড়ুন