মায়ের সঙ্গে কনডেম সেলে বড় হচ্ছে রাখি

নিয়তির কী পরিহাস। মাত্র এক মাস বয়সি শিশু, যে কি না মুক্ত আলো-বাতাসে বাবা-মা ও স্বজনদের আদর-স্নেহে বেড়ে ওঠার কথা, সে এখন ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলে বড় হচ্ছে। কারণ তার গর্ভধারিণী মা ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামি। বলছি বহুল আলোচিত ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফী হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামি কামরুন নাহার মনি ও তার এক মাস বয়সি শিশুকন্যা মুবাশিরা খানম রাখির কথা। রাফী হত্যা মামলায় কারাবন্দি অবস্থায় ২১ সেপ্টেম্বর রাতে মনি ওই কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। এরপর ২৪ অক্টোবর আলোচিত এ মামলায় মনিসহ ১৬ আসামিরই ফাঁসির আদেশ দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

রাখি অন্য দশটা শিশুর মতো পৃথিবীতে এলেও তার জন্ম হয়েছে কারাগারে। কারাবন্দি মায়ের সঙ্গে কাটছে তার জীবন। মায়ের মৃত্যুদন্ডের রায় হলে মা মনির সঙ্গে শিশুটির ঠাঁই হয়েছে ফাঁসির আসামিদের ‘কনডেম সেলে’। সেখানেই এখন তার বেড়ে ওঠা। সাধারণ কয়েদিদের মতো মায়ের সঙ্গে দিনাতিপাত করছে শিশু কন্যা রাখি। জন্মদাতা পিতা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিসহ কারোই আদর-স্নেহ পাচ্ছে না শিশুটি। এমনকি পৃথিবীর মুক্ত আলো-বাতাসও দেখতে পায়নি সে। রাখির মা কামরুন নাহার মনির অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। জীবন ফুরিয়ে আসার ভয়কে সঙ্গে নিয়ে চেয়ে আছে আদরের সন্তানের মুখের দিকে। একজন ফাঁসির আসামি বা অপরাধী হিসেবে নয়, একজন মায়ের জায়গায় ভাবলে সে বিষয়টি কতটা নির্মম-করুণ তা বোঝা যায়।

আসামি পক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু বলেন, যতদিন পর্যন্ত শিশুটি নিজ হাতে খেতে না পারবে ততদিন মণির মৃত্যুদÐ কার্যকর হবে না। তবে আমরা অতি দ্রুতই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করব।

ফেনী জেলা কারাগারে জেল সুপার রফিকুল কাদের বলেন, ‘এক ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে যেভাবে রাখা হয় আইনানুযায়ী সেভাবেই কামরুন নাহার মনিকেও রাখা হয়েছে। তার সঙ্গে ছোট্ট সন্তানটিও রয়েছে।’ তিনি বলেন, রাফী হত্যা মামলার ফাঁসির দÐপ্রাপ্ত আসামিদের কুমিল্লা কারাগারে ফাঁকা থাকলে সেখানে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে ফাঁকা না থাকলে কাশিমপুরসহ যেসব কেন্দ্রীয় কারাগারে কনডেম সেল ফাঁকা রয়েছে সেখানে আসামিদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কামরুন নাহার মনিকেও তার সন্তান নিয়ে যেতে হবে।

এদিকে কামরুন নাহার মণির স্বামী রাশেদ খান রাজু অভিযোগ করেছেন, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় অন্য এক মনি ছিলেন। যিনি রাফীর বিরুদ্ধে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। পিবিআই সেই মনিকে গ্রেফতার করেও ছেড়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন। ৯ সেপ্টেম্বর ৩৪২ ধারায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়ার সময় কামরুন নাহার মণি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। পরে পিবিআই হেফাজতে তাকে চরম নির্যাতন ও পেটে লাথি মেরে বাচ্চা নষ্ট করার হুমকি দিয়ে জবানবন্দি আদায় করে।

প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন মুখোশধারীরা। এতে অস্বীকৃতি জানালে ওই মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে রাফীর হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষ সিরাজের অনুসারীরা। মারাত্মক দগ্ধ রাফীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলে ১০ এপ্রিল রাতে মারা যান সাহসীকন্যা রাফী।


আরও পড়ুন