মিয়ানমারের বিচার শুরু ডিসেম্বরে

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোর অভিযোগে আগামী মাসে মিয়ানমারের বিচার শুরু হচ্ছে। এ জন্য আগামী ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর মৌখিক শুনানির দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। এই শুনানির ওপর ভিত্তি করে আদালত একটি অন্তবর্তীকালীন আদেশ দেবেন, যা চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

গত ১১ নভেম্বর ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা—ওআইসির পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা করে গাম্বিয়া।

আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার বিচার মন্ত্রী আবুবকর তামবাদউ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জেনোসাইড কনভেনশনের আওতায় আমরা ‘দি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ (আইসিজে)-এ আমাদের আবেদন জমা দিয়েছি। আমাদের একটাই উদ্দেশ্য, নিজের জনগণের সঙ্গে মিয়ানমার যে আচরণ করেছে সেটির জন্য তাদের জবাবদিহি করানো। আমাদের চোখের সামনে গণহত্যা ঘটবে আর আমরা তা দেখেও কিছু না করলে আমাদের প্রজন্মের জন্য তা হবে খুবই লজ্জার ব্যাপার।

গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুই দেশই ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। কনভেনশন অনুযায়ী সদস্য দেশগুলো শুধু গণহত্যা থেকে বিরত থাকাই নয় বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং এমন অপরাধের জন্য শাস্তি বিধানেও বাধ্য।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের মামলা কয়েক বছর চলার কারণে গাম্বিয়া কয়েকটি বিষয়ের জন্য অন্তবর্তীকালীন রায় প্রার্থনা করেছে।’

যেসব বিষয়ের জন্য গাম্বিয়া অন্তবর্তীকালীন আদেশ চেয়েছে সেগুলো হলো— গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমার অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে; মিলিটারি, প্যারামিলিটারি ও বেসামরিক অস্ত্রধারী ব্যক্তি যাতে কোনও ধরনের গণহত্যা সংঘটন না করে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে; মিয়ানমার গণহত্যা-সংক্রান্ত কোনও ধরনের প্রমাণ নষ্ট করবে না এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও খারাপ করে, এমন কোনও কাজ তারা করবে না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ডিসেম্বরের ১০ তারিখ গাম্বিয়া প্রথম মৌখিক শুনানি করবে এবং পরের দিন মিয়ানমারের পক্ষ থেকে শুনানি হবে। ১২ ডিসেম্বর উভয়পক্ষের প্রথম শুনানির যুক্তি খণ্ডন হবে এবং আশা করা হচ্ছে এর এক মাসের মধ্যে আদালত অন্তবর্তীকালীন আদেশ দেবেন বলে তিনি জানান।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই আদালতের বিচারকের সংখ্যা ১৫ জন এবং প্রত্যেকের উপস্থিতিতে ওই শুনানি হবে।

আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের চার মাসের মধ্যে কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তা গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়কেই জানাতে হবে বলে তিনি জানান।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও তার দল এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইনি প্রতিষ্ঠান ফলি হগ।

মিয়ানমারের পক্ষে কে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে, সেটি এখনও জানা যায়নি।

২০১৭ সালের ২৫ আগাস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু স্থাপনায় বিদ্রোহীদের হামলার পর রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভিযান। তখন বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা চলে আসেন। গত দুই বছরে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা তাদের উপর নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ তুলে ধরেন, যাকে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ।

আইসিজে হলো জাতিসংঘের প্রধান বিচারিক অঙ্গ; ১৯৪৫ সালে গঠনের পরের বছর থেকে এই আদালত কার্যকর রয়েছে।

রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনতে ১০টি সংগঠন গাম্বিয়াকে সহায়তা করছে, তাদের একটি হলো হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

এইচআরডব্লিউর পরিচালক পরম-প্রিত সিং এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, গাম্বিয়ার এই আইনি পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলো। এখন আদালত রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচাতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিতে পারে।


আরও পড়ুন