রোহিঙ্গা গণহত্যা : কাঠগড়ায় সু চি

শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার বিচারের শুনানি।  গতকাল প্রথম দিনের শুনানি শেষে আজ আবার শুরু হবে দ্বিতীয় দিনের মত এই গণহত্যা মামলার শুনানি। আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) মামলার শুনানিতে আজ গণহত্যার দায় এড়াতে নিজ দেশের পক্ষে সাফাই গাইবেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি।

নেদারল্যান্ডের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানিতে আছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের দল। হেগের এই আদালতের যেকোনো রায়ই চূড়ান্ত, পালন বাধ্যতামূলক। চূড়ান্ত রায়ের পর আপিলের কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্ব শান্তির জন্য পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ১৭ জন বিচারপতির সামনে হাজির হয়েছেন, এমন দৃশ্য অভাবনীয় হলেও গতকাল মঙ্গলবার তা-ই ঘটেছে।

মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে জাতিসংঘের শীর্ষ এই আদালতে সাবেক গণতন্ত্রের প্রতীক সু চিকে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানায় মামলার বাদী আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে টানা আন্দোলন করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন সু চি; কিন্তু এখন সেই সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়েই গণহত্যার দায় এড়াতে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেত্রীকে। সূত্র : এএফপি, আলজাজিরা

যে সু চি একময় একময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য অহিংস সংগ্রামের কারণে বছরের পর বছর কারাবন্দি হয়েছিলেন সেই তিনিই আজকের বিশ্বে ক্ষমতার ছায়াতলে এসেই ভুলে গেলেন নিজের অতীত সংগ্রামের কথা! যেই সংগ্রাম থাকে বিশ্বের কাছে পরিচিতি করে তোলে একজন সংগ্রামী  নেত্রী হিসাবে সেই তিনি আজ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দাড়ালেন  সেই সকল  সেনাদের পক্ষে  যারা হত্যা-ধর্ষণ করেই ক্রান্ত হয়নি,  প্রায় ১২ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গাকেও করেছে দেশ ছাড়া। ধ্বংস করেছে বাড়ি ঘর গ্রামের পর গ্রাম।

রক্তাক্ত এই অভিযানে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও চালানো হয়। প্রাণে বাঁচতে সেই সময় রোহিঙ্গাদের ঢল নামে প্রতিবেশি বাংলাদেশে। পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদে মুসলিম দেশ গাম্বিয়া ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্যদের উৎসাহে গণহত্যার দায়ে মামলা করে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে তোলে।

বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টার দিকে দ্বিতীয় দিনের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হবে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বৈধ অভিযান পরিচালনা করেছিল; আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতকে সু চি এমন তথ্যই জানাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এমনকি তিনি বলতে পারেন, যেহেতু রক্তাক্ত অভিযানের ব্যাপারে মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ তদন্ত করছে, সেহেতু এই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের বিচার করার কোনো এখতিয়ার নেই।

ফরাসী বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, বুধবার আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে দেশের হয়ে সু চির যুক্তি উপস্থাপন ইয়াঙ্গুনে বড় পর্দায় সরাসরি সম্প্রচার করবে দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা। এতে ব্যাপক জনসমাগম হতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে দেশটির নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসা সু চির জনপ্রিয়তা দেশটিতে এখন আকাশচুম্বী।

মামলার বাদী গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবু বকর তামবাদু বলেছেন, মিয়ানমার কোনো ধরনের ভুল করেনি বলে অতীতের মতো একই কথা যদি সু চি আজ আবারও বলেন তাহলে সেটি হবে প্রচণ্ড হতাশাজনক।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের দিন রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের জেরে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লেইং-সহ আরও তিন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্টিভেন নুচিন বলেন, নিষ্পাপ বেসামরিকদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নির্যাতন, অপহরণ, যৌন সহিংসতা, খুন অথবা নিষ্ঠুরতা সহ্য করবে না যুক্তরাষ্ট্র।

গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ লড়াই ও কারাবন্দি জীবনের জন্য অং সান সু চিকে একসময় নেলসন ম্যান্ডেলা ও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করা হতো। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পান সু চি।

সামরিক জান্তা শাসনামলে ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকার পর ২০১০ সালে মুক্তি পান তিনি। ২০১৫ সালে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে শাসন ক্ষমতা আসে সু চি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)।

একদা যে সেনাবাহিনী তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছিল; সেই সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইতে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ায় অনেকেই তার নিন্দা জানাচ্ছেন।

নোবেল পুরস্কার বিতর্ক
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চির রোহিঙ্গা নিধনে চুপ থাকা এবং সামরিক জান্তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গণহত্যা সমর্থন করায় তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি ওঠে বিশ্বব্যাপী।

২০১৭ সালে চার লাখেরও বেশি মানুষ একটি অনলাইন পিটিশন স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে সু চির নোবেল প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে।

সুচির জাতিবিদ্বেষী আচরণ

রোহিঙ্গা নিধনের ব্যাপারে বিবিসির এক সাংবাদিক সু চির সাক্ষাৎকার নিতে গেলে সেখানে তিনি বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। মিশাল হোসেন নামে সাংবাদিককে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারে আং সান সু চিকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে মিয়ানমারের আচরণ নিয়ে অনেক অপ্রিয় এবং কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

২০১৩ সালে ওই সাক্ষাৎকারের পর সু চি মন্তব্য করেছিলেন, ও (মিশাল হোসেন) যে একজন মুসলিম কেউ তো আগে আমাকে জানায়নি।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারে ধারাবাহিক নির্যাতনের ব্যাপারে অং সান সু চি তার নিশ্চুপ ভূমিকার কারণে সমালোচিত হয়েছেন। তিনি এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে এমন অনুরোধও জানিয়েছেন যেন রোহিঙ্গাদের এই নামে উল্লেখ করা না হয়।


আরও পড়ুন