জাতীয় - প্রচ্ছদ - December 14, 2019

দামের আগুনে পানি ঢালল দেশি পেঁয়াজ

টানা আড়াই মাস পেঁয়াজের ‘আগুনে’ পুড়েছে দেশের মানুষ। দাম কমাতে মিসর, তুরস্ক, চীন, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে আনা হয়েছে পেঁয়াজ। স্থলবন্দর, নৌবন্দর, সমুদ্রবন্দরের পাশাপাশি বিমানে চড়িয়েও আনা হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। পেঁয়াজের ঝাঁজে পুড়তে হয়েছে ভোক্তাকে।

অবশেষে পেঁয়াজের আগুনে পানি ঢালল দেশি পেঁয়াজই। অর্থাৎ বাজারে দেশি নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমে এসেছে অনেক খানি। সেই সঙ্গে বাজারে পেঁয়াজের হাহাকারও কমে এসেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর থেকেই দেশের বাজারে সংকট দেখা দেয় পণ্যটির। লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়ে এক সময় এক কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় ঠেকে। দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস পেঁয়াজের কেজি ছিল ২০০ টাকারও ওপরে।

এখনও পুরনো পেঁয়াজের কেজি কোনো কোনো বাজারে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। কিন্তু ১০০ টাকা কেজি দরের নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসায় ওই ২৫০ টাকার পেঁয়াজের দিকে আর ঘুরেও তাকাচ্ছেন না ক্রেতারা। ফল স্বরূপ পাইকারি বাজারে এক দিনের ব্যবধানে পুরনো পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫০ টাকা কমেছে। দুয়েক দিনের মধ্যে খুচরাতেও এর প্রভাব দেখা যাবে।

অন্যদিকে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে ট্রাকের পেছনে ক্রেতাদের যে যুদ্ধ গত প্রায় এক মাস ধরে দেখা গেছে, সে লড়াইও এখন নেই। টিসিবির ট্রাকের সামনে ভিড় কমে গেছে। টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে আগের মতো আর হুড়োহুড়ি চোখে পড়ে না। উল্টো শুক্রবার ক্রেতার অভাবে টিসিবির ডিলারদের ডেকে ডেকে পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে।

শুক্রবার রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে প্রতিকেজি নতুন দেশি পেঁয়াজ মানভেদে ৫০ থেকে ৮০, চীনা পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০, মিসরিয় পেঁয়াজ ৭৫ থেকে ৮৫ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

পাইকারি বাজারে দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমায় খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চীনা পেঁয়াজ এখনও ৭০ থেকে ৮০ , মিসরিয় পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১২০ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে দেশি নতুন পেঁয়াজ প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় চীনা ও মিসরিয় পেঁয়াজের কদর কমে গেছে। এ কারণে সেগুলোর দামও কম। এমনটিই জানালেন কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান।

তিনি বলেন, পেঁয়াজের বাজার আগের চেয়ে এখন অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ আরও বাড়লে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম আরও কমে যাবে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে সবজি বাজার নাগালের বাইরে থাকলেও শীতকালীন সবজির আমদানি বাড়ায় কমেছে শাক-সবজির দাম। ৩০ থেকে ৫০ টাকায় মিলছে প্রায় সব ধরনের সবজি। শুক্রবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

কল্যাণপুর নতুন বাজারের সবজি বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম জানান, প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কমেছে। দাম আরও কিছুটা কমবে। তিনি প্রতিপিস ফুলকপি বিক্রি করছেন ২০ থেকে ৩০ টাকায়। বাঁধাকপি বিক্রি করছেন ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। শিম বিক্রি করছেন ৪০ থেকে ৫০ আর নতুন আলু বিক্রি করছেন ৪০ টাকা কেজি। এ ছাড়া করলা, বেগুন, ঢেঁড়স বিক্রি করছেন ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। আর বরবটি আর উস্তে বিক্রি করছেন ৬০ টাকায়। ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হওয়া টমেটো বিক্রি করছেন ৮০ টাকায়।

কল্যাণপুরের বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, এখন শীতের সবজির মৌসুম। বাজারে সব ধরনের শীতের সবজি ভরপুর রয়েছে। সবজির দাম কমবে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যে হারে সবজির দাম কমার কথা সে হারে কমেনি।

এ ছাড়া কিছুটা কম দামে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বাজারে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায়। তবে পাকিস্তানি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়, আর লেয়ার মুরগি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে আগের মতোই গরুর মাংস ৫৩০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রতিকেজি ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকায়। এ ছাড়া প্রতিকেজি তেলাপিয়া বিক্রি হয় ১৫০-১৬০, রুই মাছ কেজিপ্রতি ২৮০ থেকে ৩০০, কাতলা ২৮০-৩৫০, শোল মাছ প্রতিপিস ৩৫০ থেকে ৫০০, শিং মাছ প্রতিকেজি  ৪০০, চিংড়ি প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৬৫০, পুঁটি মাছ ১৫০-২০০ ও টেংড়া প্রতিকেজি  ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ডেকে ডেকে পেঁয়াজ বিক্রি করে টিসিবির ডিলাররা শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর মতিঝিলে বলাকা ভাস্কর্যের সামনে টিসিবির একটি পেঁয়াজ ভর্তি ট্রাক থেকে সুমন মিয়া নামে এক যুবক পথচারীদের উদ্দেশে বলছিলেন, যত কেজি খুশি পেঁয়াজ নিয়ে যান। দামে কম, ভিড়ভাট্টা নেই। এমন সুযোগ আর পাবেন না।

মিসর থেকে আমদানি প্রতিকেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকায় বিক্রি করার জন্য ওই ট্রাকের ওপরে ও নিচে চারজন কর্মচারী সঙ্গে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। কিন্তু পেঁয়াজ কেনার জন্য ক্রেতা ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ জন। তারা লাইন ছাড়াই ট্রাকের সামনে থেকে যত কেজি ইচ্ছা তত কেজি পেঁয়াজ নিয়ে যাচ্ছিলেন।

মাত্র কয়েকদিন আগেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পেঁয়াজ স্বল্পমূল্যে কেনার জন্য বিশাল লাইন থাকত। একজন ব্যক্তির কাছে এক কেজির বেশি পেঁয়াজ বিক্রি করা হতো না। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঘণ্টা দুয়েক লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে। আবার শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেককে খালি হাতেও ফিরতে হয়েছে।

টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রেতা সুমন মিয়া জানান, আড়াই টন পেঁয়াজ নিয়ে দুপুর ১২টা থেকে ওই স্থানে অপেক্ষা করেন। কিন্তু দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ২০ কেজি পেঁয়াজও বিক্রি হয়নি। তিনি বলেন, গত সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারিভাবে বিক্রির জন্য প্রতিদিন মাত্র এক টন দেওয়া হতো। কিন্তু এখন প্রতিদিন ট্রাক অনুযায়ী সর্বোচ্চ চার টন পেঁয়াজ দেওয়া হচ্ছে। আগে প্রতিজনকে এক কেজি করে দেওয়া হলেও গত দুদিন ধরে ৪ কেজি করেও দেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার হওয়ায় ক্রেতা কম। তাই ক্রেতা যত খুশি তত কেজি কিনে নিয়ে যাচ্ছে।


আরও পড়ুন