জাতীয় - প্রচ্ছদ - January 16, 2020

পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে ভারত, অনুরোধ ভেবে দেখবে বাংলাদেশ!

ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকার চাহিদা প্রত্যাহার করে নেয়ায় পেঁয়াজ নিয়ে ভালোই বিপাকে পড়েছে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির সরকার। আর এই বিপদ থেকে উদ্ধার হতে এখন বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি করতে চাইছে ভারত।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার রকিবুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দেশীয় চাহিদার ভিত্তিতে আমদানিকৃত পেঁয়াজ রাজ্য সরকাররা কিনতে রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশকে কিনে নেয়ার প্রস্তাব দেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী।

বৈঠকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারতের জ্যেষ্ঠ এক সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দেশটির ইংরেজি দৈনিক দ্য প্রিন্ট এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ভারত বিদেশ থেকে মোট ৩৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি করেছে। ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে ১৮ হাজার টন পেঁয়াজ পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রদেশের সরকার আমদানিকৃত পেঁয়াজের মাত্র ৩ হাজার টন নিয়েছে। অবশিষ্ট পেঁয়াজ মুম্বাইয়ের জওহরলাল নেহরু বন্দরে খালাসের অপেক্ষায়।

আর পেঁয়াজ বাংলাদেশকে কিনতে ভারতের অনুরোধের খবর গণমাধ্যমে আসার পর আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

‘ভারত যে দামে পেঁয়াজ আমদানি করেছে তার চেয়েও কম দামে বাংলাদেশকে দিতে চাচ্ছে’ বলে খবর শোনা যাচ্ছে এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাইস (দাম) কী সেটা ম্যাটার না। আমরা অফিসিয়ালি এ রকম কোনো প্রোপোজাল (প্রস্তাব) পাইনি। তাছাড়া এটা আমাদের কনসিডারেশনের (বিবেচনা) নেই। এ ধরনের প্রস্তাব এলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়েই আসবে। আর আমরা যদি অফিসিয়ালি কোনো প্রস্তাব পাই তাহলে বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।’

যদি প্রস্তাব আসে তাহলে সরকার কী করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রোপোজাল আসলে দেখে বিবেচনা করবো, কী ধরনের প্রোপোজাল। কিন্তু আমরা তো এখন নিজেরাই সরাসরি আমদানি করছি। তারপরও যদি সুইটেবল হয় দেখা যাবে। বাট, এখন আমাদের এটা কনসিডারেশনে নেই।’

এদিকে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে আগামীতে পেঁয়াজের মূল্য আরও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ভারত পেঁয়াজ রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। সরকারও পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষকদের প্রণোদনাসহ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে বাজারে পেঁয়াজের মূল্য কমতে শুরু করেছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে পেঁয়াজের দাম বেশি। আমরা দেখেছি ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধজ্ঞা তুলে নিয়েছে। দেশেও পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হয়েছে। অন্যান্য দেশেও মৌসুম শুরু হবে। তাই কোনো ক্রমেই পেঁয়াজের দাম ১১০ টাকা থাকবে না। আমি খুবই আশাবাদী পেঁয়াজের দাম কমে আসবে।’

আওয়ামী লীগের সদস্য এম আব্দুল লতিফের সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সারাদেশে পেঁয়াজ নিয়ে নানা রকম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিলো। এখন স্থিতিশীল পর্যায়ে এসেছে। যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, তবে আগামীতে পেঁয়াজ নিয়ে কোনো সঙ্কট সৃষ্টি হবে না। যদি আমদানি করতেই হয়, তবে আগে থেকেই আমদানির ব্যবস্থা করা হবে। কৃষকরা যাতে পেঁয়াজের উৎপাদনের ন্যায্য মূল্যে পায়, স্থানীয় পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘পেঁয়াজের বিষয়টি সরকার এবার গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। অতীতের তুলনায় এবার অধিকহারে পেঁয়াজ উৎপাদন হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পেঁয়াজের মৌসুমে আমদানি বন্ধ করে দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্যে পায় সে ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা নেই। পেঁয়াজ পচনশীল ফসল। এ কারণে মৌসুমে কৃষকরা পেঁয়াজ খুব অল্পমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এতে পেঁয়াজ উৎপাদনে তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। আগামীতে এটা যাতে না হয় সে ব্যাপারে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

বাংলাদেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয় তা দিয়ে চাহিদা পুরণ হয় না। দাম কম ও সহজ পরিবহনের কারণে সাধারণত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে প্রয়োজনীয় পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।

তবে এ বছর ভারতের মহারাষ্ট্র ও অন্য এলাকায় বন্যার কারণে পেঁয়াজের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত সেপ্টেম্বরে রফতানির ক্ষেত্রে ভারত প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজের মিনিমাম এক্সপোর্ট প্রাইস (এমইপি) নির্ধারণ করে দেয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে। এর পর দেশের বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম।

দফায় দফায় দাম বেড়ে রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবচেয়ে বেশি দামের পণ্যের তালিকায় সবার ওপরে স্থান করে নেয় পেঁয়াজ। ৩০ থেকে ৪০ টাকার পেঁয়াজের দাম ২৫০ থেকে ২৭০ টাকায় পৌঁছায়। এ অবস্থায় দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে টিসিবির মাধ্যমে সারাদেশে পেঁয়াজ বিক্রি কার্যক্রম বাড়ানো হয়। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। পরবর্তীতে দেশজুড়ে বাজারে বাজারে অভিযান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস, বড় চালান আসার খবর- কোনো কিছুই থামাতে পারেনি না পেঁয়াজের দরবৃদ্ধি।

শেষ ভরসা হিসেবে দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকেন দিশেহারা ক্রেতারা। অবশেষে পেঁয়াজ আসে বাজারে, কিছুটা স্বস্তি মেলে। তারপরও এখনও দেশি পেঁয়াজ ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।


আরও পড়ুন