জাতীয় - প্রচ্ছদ - January 24, 2020

আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশে রাখাইনে ফেরার আশা দেখছেন রোহিঙ্গারা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) দেওয়া চারটি অন্তবর্তীকালীন নির্দেশনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা।

তারা মনে করেন, আইসিজের এই নির্দেশনার মধ্যদিয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের পথ অনেকটা সুগম হয়েছে। বাপ-দাদার ভিটে-মাটি রাখাইনে যেতে পারবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছেন রোহিঙ্গারা। 

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে ‘জাতিগত নিধন’ চালায় মিয়ানমার। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে এ সময় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। 

এই নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলা করে গাম্বিয়া। এ মামলায় বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও সংঘাত যাতে আরও তীব্রতর না হয় এজন্য অবশ্যই পালনীয় চারটি নির্দেশনা দিয়েছে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত। 

এদিকে এ মামলার অর্ন্তবর্তীকালীন রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার উখিয়া- টেকনাফে বসবাসরত লাখ লাখ রোহিঙ্গার নজর ছিল আন্তজার্তিক আদালতের বিচার কার্যক্রমের দিকে। দুপুরের পর থেকে ক্যাম্পের ভেতরে টেলিভিশনে এ বিচার কার্যক্রম সরাসরি দেখার জন্য চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়ার একটি চায়ের দোকানে দেখা গেল, উৎসবমুখর পরিবেশে রোহিঙ্গারা ‘উপভোগ’ করছেন বিচার কার্যক্রম।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস নেতা মাস্টার আব্দুর রহিম বাংলানিউজকে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালানো হয়েছে। গণহত্যা চালানো হয়েছে। আজ আন্তজার্তিক আদালতের এ রায়ে মিয়ানমারের প্রতি যে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আমরা মনে করি এটি রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রাথমিক বিজয়।

‘এ রায়ের মধ্যদিয়ে প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্ব এবং নিরাপত্তা যে দাবি করে আসছি আমরা তা পাবো  মনে করছি।’

লম্বাশিয়ার মো. হামিদ মাঝি বাংলানিউজকে বলেন, এ রায়ের জন্য রোহিঙ্গাদের দাবি-দাওয়া পূরণ হবে। মিয়ানমারের ওপর আন্তজার্তিক চাপ আরও বাড়বে। আমরা খুবই খুশি।

একই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা নাজিম বাংলানিউজকে বলেন, বৃহস্পতিবার সারাদিন লাখ লাখ রোহিঙ্গা শুধু এই মামলার বিচারের দিকে চেয়েছিল। আমরা আশাবাদী ছিলাম, এটি চূড়ান্ত কোনো রায় না হলেও আন্তজার্তিক আদালত অর্ন্তবর্তীকালীন যে নির্দেশনাগুলো দেবেন তা রোহিঙ্গাদের পক্ষে আসবে। আমাদের সেই আশা পূরণ হয়েছে।

‘কারণ রোহিঙ্গাদের ওপর যে জুলুম নির্যাতনগুলো মিয়ানমারে করা হয়েছে তা আল্লাহ-তায়ালা দেখেছেন। উনি নিশ্চয়ই ন্যায়বিচার করবেন। আমরাও তারই সৃষ্টি,’ যোগ করেন তিনি।

কুতুপালং ক্যাম্প-২ বাসিন্দা মো. আমিন বলেন, গাম্বিয়া মিয়ানমারকে বিশ্বসম্প্রদায়ের সামনে বিচারের মুখোমুখি করেছে সেজন্য দেশটির জন্য হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করছি। আমরা আশা করছি এ মামলার কারণে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সব দাবি-দাওয়া মানতে বাধ্য হবে। রোহিঙ্গাদের সব অধিকার ফেরত পাবো।

বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের হেগে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) অন্তর্বর্তী নির্দেশ বিষয়ক এ রায় পড়তে শুরু করেন আইসিজের প্রেসিডেন্ট আব্দুল কাওয়াই আহমেদ ইউসুফ।

অন্তর্বর্তী চার নির্দেশনা হলো-

এক. মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সব ধরনের হত্যা, হত্যা প্রচেষ্টা নিরসন করতে হবে। সেই সঙ্গে দূর করতে হবে তাদের যে কোনো রকমের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির আশঙ্কা। নিশ্চিত করতে হবে তাদের অধিকার। 

দুই. দেশটির সেনাবাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী বা যে কেউ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর ব্যাপারে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র, উস্কানি বা কুকর্মে সহযোগিতার সুযোগ পাবে না, তা নিশ্চিত করতে হবে।  

তিন. রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ধরনের প্রমাণ ধ্বংস করা যাবে না। সব প্রমাণ অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে।  
 
চার. এসব নির্দেশ যথাযথভাবে যে পালিত হচ্ছে, ৪ মাস পর মিয়ানমার সে বিষয়টি নিশ্চিত করে আইসিজেকে প্রতিবেদন দাখিল করবে। এরপর থেকে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক ৬ মাস অন্তর অন্তর মিয়ানমারকে এ বিষয়ক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। সেসব প্রতিবেদন গাম্বিয়াকে দেওয়া হবে। গাম্বিয়া সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের মতামত জানাবে।  

এর গত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর তিনদিন হেগে এ মামলার শুনানি হয়। তাতে মিয়ানমারের পক্ষে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি অংশ নেন। সে সময় তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। এছাড়া গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার রাখে না বলেও দাবি করা হয় মিয়ানমারের পক্ষে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১১লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন।


আরও পড়ুন