বাংলাদেশসহ শতাধিক দেশের তথ্য চুরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বস্ত সুইজারল্যান্ডভিত্তিক গোয়েন্দা যন্ত্রাংশ বিক্রির একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা গোপনে কিনে নিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বিক্রি করা গোপন কোড ভাঙ্গতে সক্ষম যন্ত্রটির মধ্যে এমন যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয়েছিল যাতে সংশ্লিষ্ট দেশটির অজান্তেই তাদের গোপন তথ্য চলে যেত সিআইএ ও জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার কাছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জেডডিএফ এক যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টো এজি নামের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কোড ভাঙ্গতে সক্ষম যন্ত্র কিনেছিল বাংলাদেশসহ ১২০টি দেশ।  ক্রেতার তালিকায় রয়েছে ইরান, ভারত, পাকিস্তান, ল্যাটিন আমেরিকার জান্তা শাসিত দেশগুলো, এমনকি খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভ্যাটিকান নগরী। ১৯৭০সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিআইএ এই যন্ত্রটি বিক্রির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে যেমন কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে, তেমনি জেনে নিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব গোয়েন্দা বা কূটনীতিক তথ্য। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশাল গোয়েন্দা তথ্যের সুবিধা পেয়েছিল মার্গারেট থ্যাচারের সরকার। আর্জেন্টিনা তার গোয়েন্দা ও মিত্রদের মধ্যে আদান-প্রদান করা তথ্য হাতিয়ে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

সিআইয়ের গোপন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম দুটি জানিয়েছে, ১৯৭০ সালে মেশিনটির নির্মাতা বরিস হাগেলিন থেকে ক্রিপ্টো এজি কিনে নেয় সিআইএ ও তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতো সিআইএ ও আরেক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)।

এক জার্মান বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, প্রথমদিকে এই প্রকল্পের নাম ছিল ‘থেজারাস’ এবং পরবর্তীতে এর নাম দেওয়া হয় ‘রুবিকন’। ক্রিপটো থেকে যে কোটি কোটি ডলার লাভ আসতো তা জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি মাঠ পর্যায়ের অপারেশন চালাতে ব্যবহার করতো। আর ক্রিপটোর একচেটিয়া বাজার সৃষ্টির জন্য লভ্যাংশ দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো কিনে নিতো সিআইএ।

যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মিত্র দেশগুলোর কাছে তথাকথিত নিরাপদ যন্ত্রটি বিক্রি করতো ক্রিপটো। নিরাপদ ভেবে এসব দেশের সরকার তার গোপন সাংকেতিক কূটনৈতিক বা গোয়েন্দা বার্তা এই যন্ত্রটির মাধ্যমে যখন ভাঙ্গতো তখন সিআইএ হ্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সেই তথ্য হাতিয়ে নিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাশিয়া বা চীন কখনোই এই যন্ত্রটি কেনেনি।

১৯৯২ সালে ক্রিপটোর এক প্রতিনিধিকে আটক করে ইরান। কয়েক মাস ইরানের কারাগারে থাকার পর ১০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেয় বিএনডি। এর পরের বছর রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিবেচনায় জার্মান গোয়েন্দা সংস্থাটি ক্রিপটো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। প্রায় একইসময় সিআইএও প্রকল্প থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। তবে প্রাপ্ত নথিতে দেখা গেছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ক্রিপটোর মালিকানায় সিআইএ ছিল এবং প্রকল্পটি অব্যাহত ছিল।

এ ব্যাপারে সুইস প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্যারোলিনা বোহরেন বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, গণমাধ্যমের অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিপটোর বিষয়টি তার মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদকে জানিয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের এক প্রাক্তন বিচারপতিকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জুনের শেষ নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যাবে।


আরও পড়ুন