ক্যাম্পাস - March 5, 2020

চবিতে রাতভর সংঘর্ষ-ভাঙচুর, আহত ৩০

রাতভর দফায় দফায় সংঘর্ষের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা ছাত্রলীগের তিন উপপক্ষের ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ৩০জন আহত হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে। গত বুধবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে তিনটা পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল দিবাগত রাত দেড়টায় শাখা ছাত্রলীগের উপপক্ষ সিক্সটি নাইন ও কনকর্ড এফ রহমান ও আলাওলে হলে থাকা বিজয়ের কর্মীদের ওপর হামলা চালায়।

এ সময় বিবদমান দুই পক্ষ লাইটের বাল্ব, অন্তত ৫০টি কক্ষের দরজা, জানালা এবং ওয়াশরুমের ভ্যাসিন ও আয়না ভাংচুর করে। ঘন্টাখানেকের তান্ডবের সময় ছয়টি ককটেল বিস্ফোরণ করা হয়। একপর্যায়ে এফ রহমান হলে থাকা বিজয় উপপক্ষের কর্মীদের বের করে দেয়া হয়।

পরবর্তীতে আবার ধাওয়া দিয়ে নিজেদের হল দখলে নেয় বিজয়। পরবর্তীতে পৌনে ৩টায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে আটক করে হাটহাজারী থানা পুলিশ। পরে যাছাই বাছাই শেষে ৭ জনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়।

বিবদমান তিনপক্ষের সিক্সটি নাইন ও কনকর্ড নগর মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীনের অনুসারী এবং বিজয় পক্ষ শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।       

বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, রাতে আহত অবস্থায় ২৭ জন চিকিৎসা নিতে আসে। আজকে সকালে আরো কয়েকজন আহত শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিয়েছে। আহতদের বেশির ভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছে। এদের মধ্যে ৭-৮ জন বেশি আহত হওয়ায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় আটককৃতরা হলেন- সিক্সটি নাইন পক্ষের কর্মী ও রসায়ন বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম শাহরিয়ার, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের জোবায়ের আহমেদ নাদিম, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের মাশরুর অনিক, পরিসংখ্যান বিভাগের ১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের আকিব জাবেদ, ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের রুম্মান, হায়দার। বিজয় পক্ষের কর্মী ও ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জিন্নাত মজুমদার ও কনকর্ড পক্ষের কর্মী জিসান।

হাটহাজারী থানার তদন্ত কর্মকর্তা রাজিব শর্মা বলেন, আটক ৭ জনকে থানায় রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিজয় উপপক্ষের নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, মধ্যরাতে আমাদের কর্মীদের ওপর একযোগে হামলা চালিয়েছে ইকবাল টিপুর অনুসারীরা। ইকবাল টিপু ইয়াবা আসক্ত, যেটা তার ডোপটেস্ট করা হলে প্রমাণ পাওয়া যাবে। তারা ঘুমন্ত কর্মীদের ৮১টি কক্ষ ভাংচুর করেছে, নগদ টাকা ও ল্যাপটপ ছিনতাই করেছে। সেজন্য তাকে শাস্তির আওতায় আনতে প্রশাসনকে বলেছি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছেও মূলনীতি বিরোধী কাজের জন্য সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানাই।  

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক এবং সিক্সটি নাইনের নেতা ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, আমাদের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী সায়েম হলে যাওয়ার সময় বিজয়ের কর্মীরা কুপিয়ে জখম করেছে। পরে আলাওল আর এফ রহমান হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের  ওপরও শিবিরের কায়দায় হামলা চালায় তারা। এ ঘটনায় নেতৃত্বদাতা ইলিয়াসের (বিজয়ের নেতা) ব্যাপারে আমরা কেন্দ্রে জানিয়েছি। সে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরীরের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে আরো আগে থেকে বলে আসছি। এ ছাড়া সহকারী প্রক্টর রিফাত স্যারও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এসব ঘটনায় ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তার পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এসএম মনিরুল হাসান বলেন, তাদেরকে বারবার শান্ত থাকতে বলা হলেও তারা সংঘর্ষে জড়িয়েছে। আমরা পুনরায় তাদের সবপক্ষের সাথে আলোচনা করব। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে প্রশাসন শক্ত ভূমিকা পালন করবে।

উল্লেখ্য, গত সোমবার রাতে আলাওল হলের ২৩৪ নম্বর কক্ষ নিয়ে বিজয় গ্রুপের এক কর্মীর সঙ্গে কনকর্ডের কর্মী ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বোরহানুল ইসলামের ঝামেলা হয়। এর মীমাংসা করতে গেলে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বিজয় গ্রুপের কর্মী আবীর হাসান তাকে চড়-থাপ্পড় দেন।

এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার রাতে ক্যাম্পাসে ট্রেন এলে জিরো পয়েন্টের কাছে আবীরকে পেয়ে মারধর করে বোরহান ও তার সহযোগীরা।এ খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এ নিয়ে বুধবার দিনভর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করে। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে বিজয় গ্রুপ এবং শাহজালাল হলের সামনে কনকর্ড গ্রুপ অবস্থান নেয়। তাদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিকে বিজয় কর্মীদের ছোড়া ইটের আঘাতে কনকর্ড গ্রুপের এক কর্মী শাহ আমানত হলের উত্তর পাশের এলাকায় আহত হলে তার সঙ্গীরা তাকে শাহজালাল হলের ভেতর নিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বিজয় গ্রুপের কর্মীরা কনকর্ডের কর্মীদের ওপর হামলা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

একপর্যায়ে শাহজালাল হলের গেট ও ভেতরে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় শাহজালাল হলে থাকা সিটি মেয়র আ জ ম নাসিরের অনুসারী উপ-গ্রুপগুলো এক হয়ে ধাওয়া করে বিজয়ের কর্মীদের। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।


আরও পড়ুন