নির্দেশনা অমান্য, ঘর ছেড়ে বাইরে মানুষ

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নোভেল করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) আতঙ্কে ভুগছে পুরো বিশ্ব। এরই মধ্যে সারা পৃথিবীব্যাপী এ ভাইরাস প্রাণ নিয়েছে ৩৪ হাজার মানুষের। ঘরের বাইরে না বেরিয়ে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বিশ্ব। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মত বাংলাদেশেও একই ধরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে করোনার ভয়াবহতার তীব্রতা এখনো আঁচ করতে পারেনি দেশের সাধারণ মানুষ। নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হরহামেশায়েই বাহিরে ঘোরাফেরা করছেন অনেকে।

দেশে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে গণপরিবহন চলাচল সীমিত রাখা, সব রকম সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞাসহ ১০ দফা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনা মোকাবেলায় এগিয়ে এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক এসব উদ্যোগের মূল কারণ জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। তবে জনসাধারণের একটি অংশ এসব নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে হরহামেশেয়ই ঘর থেকে বের হচ্ছেন। করোনা ঝুঁকিতে ফেলছেন দেশকে।

কেউ খাবার, কেউ ওষুধ কিনতে বের হয়েছেন। কারো জরুরী টাকার প্রয়োজন। আবার কারো বাইরে বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। এরকম নানা অজুহাতে মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে। তবে রাস্তায় সবচেয়ে বেশি বেরিয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।

সোমবার রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনের তুলনায় রিক্সার যাত্রীর সংখ্যা বেশি। নগরীর সিএসজি যাত্রীও ছিলো মোটামুটি। তাছাড়া বিভিন্ন মোড়ে যাত্রীর অপেক্ষায় ভাড়ার চালিত মোটর বাইক নিয়ে অপেক্ষারত চালক। প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করছেন মানুষ। বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দিতে দেখা গেছে অনেকের। চায়ের দোকানে ভিড় গত কয়েকদিনের তুলনায় বেশি। নগরীর হাতিরঝিলে বিকেলে ছিলো লোকারণ্য। এছাড়া নগরীর অলিগলিতেও লোকজনের চলাচল ছিলো চোখে পড়ার মত।

কারওয়ান বাজারে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের মতো কাঁচাবাজারের দোকান বসেছে। মানুষও কেনাকাটা করছে হরদম। শাক-সবজির দামও তুলনামূলক কম। করোনার কারণে যে শারীরিক দূরত্ব থাকা প্রয়োজন, তা নেই। নিউমার্কেট কাঁচা বাজার এলাকায় একই চিত্র।

নিউ মার্কেট কাঁচা বাজারে এসেছেন আজিমপুরের স্থানীয় বাসিন্দা হান্নান মিয়া। তিনি বলেন, বাসার বাজার-সওদা শেষ, তাই কেনাকাটা করতে আসলাম। খাওয়া-দাওয়া তো করতে হবে। ক্ষুধা তো আর লকডাউন মানে না।

রাজধানীর গ্রিন রোডে অস্থায়ী চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন বেশ কয়েকজন। সেখানে কথা হয় বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী আরাফাত হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, সবাই ছুটিতে বাসায় অবস্থান করছেন, কিন্তু হাসপাতাল তো আর বন্ধ থাকে না। কর্মস্থলে আসতে হয়। একারণে কাজের ফাকে একটু চা খেতে বের হয়েছি।

নগরীর শাহবাগে যাত্রীর আশায় রিক্সা নিয়ে বসে ছিলেন মতিন মিয়া। থাকেন হাজারীবাগ এলাকার সেকশনে। তিনি বলেন, ভাইরাসের ভয়ে তো আর ঘরে বসে থাকতে পারবো না। রিক্সার প্যাডেল না ঘুরালে ইনকাম হবে না। ইনকাম না হইলে খাবো কি আর গ্রামে বা টাকা পাঠাবো কিভাবে? এ কারণে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।

রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় ভ্যান গাড়িতে মুখের মাস্ক বিক্রি করছেন মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ। থাকেন ফার্মগেটের তেজতুরি বাজার এলাকায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আইটেমের পণ্য বিক্রি করি। এখন মাস্কের চাহিদা বেশি, তাই এটা নিয়ে বসেছি। বিক্রিও ভালো। ঘরে বসে থাকলে তো আর বেচা-বিক্রি হবে না। সংসার চালাতে গেলে বাহিরে বের হতে হবে। নগরীর রামপুরা কাঁচাবাজার এলাকায় মোবাইল রিচার্জের জন্য বের হয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অমিত হাসান। পরিবারের সাথে তিনি রামপুরা এলাকায় বসবাস করেন। তিনি বলেন, গত তিন দিন বাসার বাইরে বের হইনি। ফোনে ব্যালেন্স শেষ তাই একটু বের হলাম। একই সাথে প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটাও সেরে ফেললাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা প্রতিরোধ কারও একার পক্ষে সম্ভব নয়। সম্ভব নয় শুধু সরকারের পক্ষেও। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি ঘরে করোনা প্রতিরোধে সচেতন হতে হবে। প্রতিটি ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থান থেকে করোনা প্রতিরোধে বিশাল এবং প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারেন। করোনা প্রতিরোধে একটি চমৎকার এবং সবার জন্য অবশ্য করণীয় পদ্ধতির নাম সামাজিক দূরত্ব (Social Distancing)। সামাজিক দূরত্বকে শারীরিক দূরত্ব ও বলা হয়ে থাকে। সামাজিক দূরত্ব হলো সংক্রমণ প্রতিরোধের একটি কার্যকর পদ্ধতি যার মূল উদ্দেশ্য হলো সংক্রমণ ছড়ানোকে থামানো কিংবা কমানো। সামাজিক দূরত্ব তৈরির মাধ্যমে সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যের কাছে রোগ সংক্রমণ হবে না এবং অসংক্রমিত ব্যক্তি সংক্রমিত হবে না। যেসব রোগব্যাধি হাঁচি/কাশি (ড্রপলেট) সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ, পরোক্ষ সংস্পর্শ (সংক্রমিত বস্তুর স্পর্শ) বা বাতাসে ছড়ায় সেসব রোগ সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রথমে বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে প্রশাসন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সাধারণ মানুষকে গত কয়েকদিন বাসা থেকে খুব একটা বের হতে দেখা যায়নি। তবে দেশব্যাপী কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে সমালোচিত হয়। এমনকি পুলিশ প্রধানের পক্ষ থেকেও সহনশীলতা, পেশাদারিত্ব ও বিনয়ের সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর থেকেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমরা আমাদের সাধ্য মত চেষ্টা করে যাচ্ছি মানুষ যাতে ঘরে থাকে সে জন্য। অনেক জায়গায় পুলিশের পক্ষ থেকে খাবারও পৌঁছে দেয়া হয়েছে। তারপরেও অনেকে বিভিন্ন কারণে বের হচ্ছেন। আমাদের আরো সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশে দুইদিন পরে নতুন একজন কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জনে। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এই তথ্য জানিয়েছেন। নতুন যিনি আক্রান্ত হয়েছেন, তিনি একজন নারী, বয়স বিশের কোঠায়। তবে তিনি কীভাবে আক্রান্ত হয়েছেন বা তার সম্পর্কে বিস্তারিত আর কোন তথ্য জানাতে পারেনি আইইডিসিআর। এর আগে গত রোববার সংস্থাটি জানিয়েছিল যে, আগের দুইদিন ধরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোন রোগী পাওয়া যায়নি। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন ৩২ এবং আইসোলেশনে রয়েছেন ৬২ জন। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন থেকে ৩৬ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও। এ পর্যন্ত ৬ লক্ষ ৩৪ হাজার ৮৩৫ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩,১৫৯ জন। এদের মধ্যে ২৯,৯৫৭ জন মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৩,৪৬৪ জন। দক্ষিণ এশিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ৬২৪ জন আর মারা গেছেন ১৩৯ জন।

গত ৮ই মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। এরপর ১৮ই মার্চ প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর কথা জানায় আইইডিসিআর। গত বুধবার প্রথম সংস্থাটি জানায় যে ঢাকায় সীমিত আকারে কম্যুনিটি সংক্রমণ হচ্ছে বলে তারা সন্দেহ করছে।


আরও পড়ুন